বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪১ পূর্বাহ্ন

নববর্ষ: রমনা বটমূলে মানুষের ভিড়, প্রত্যাশা শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিক

আজ ১৪ এপ্রিল বাংলা বর্ষপঞ্জিতে শুরু হলো ১৪৩৩ সনের দিন গণনা। সূর্যোদয়ের পর রাজধানীর রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ দিনটি শুরু হয়েছে।

এবারের বর্ষবরণের মূল বার্তা, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’-সেখানেই বাঙালির জয়। 

আর নতুন বছরকে বরণ করতে রাজধানীর রমনা পার্কে নেমেছে মানুষের ঢল।

সময় যত গড়িয়েছে, বেলা যত বেড়েছে ততই ভিড় বাড়তে দেখা গেছে অনুষ্ঠানস্থলে। ছোট থেকে বড় সকলে দলে দলে হাজির হচ্ছেন রমনা বটমূলে।
এখানে বয়স কোনো বাধা নয়, ইচ্ছাশক্তিই বড় বিষয়। সকাল সোয়া ৬টায় শুরু হওয়া এ উৎসবে অংশ নিয়েছেন ধর্ম, বর্ণ, ধনী, গরিব নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
ফলে পহেলা বৈশাখের এই আয়োজন রূপ নিয়েছে এক বিপুল বর্ণাঢ্য মহোৎসবে। নববর্ষের এই প্রাক্কালে সবার প্রত্যাশা—অশান্তি, বিভাজন ও ভয়ের পরিবর্তে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতা। 

এর আগে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগ্নে’ গানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে আজকের আয়োজন। এর পরপরই পরিবেশিত হয় ‘এ কী সুগন্ধহিল্লোল বহিল’ ও ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে’ গান দুটি।

এবারও অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁইয়ের গান, লোকগানের পাশাপাশি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গান দিয়ে। এছাড়া এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষ সংযোজন থাকবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ ও প্রয়াত বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার, সুরকার ও চিত্রশিল্পী মতলুব আলীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের গান। মোট ২২টি গান পরিবেশিত হবে প্রায় দুই ঘণ্টার এ অনুষ্ঠানে। এর মধ্যে ৮টি থাকবে সম্মেলক গান, আর একক কণ্ঠের গান থাকবে ১৪টি। পাঠ থাকবে দুটি। ছায়ানটের শিশু বিভাগের শিক্ষার্থীসহ সব বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশিষ্ট শিল্পী মিলিয়ে প্রায় ২০০ শিল্পী অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) রমনা বটমূলে দেখা যায়, বর্ষবরণ দেখতে দলে দলে আসছেন নারী-পুরুষ ও শিশু। রাগালাপ, গান আর আবৃত্তিতে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে বাংলা নববর্ষকে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রমনায় মানুষের ভিড় বাড়ছে। সব দর্শনার্থী যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এ আয়োজন উপভোগ করছেন। মঞ্চের সামনের বসার জায়গা মানুষে পূর্ণ। ফলে অনেকে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখছেন।

শাহবাগ ও মৎস্যভবনের সামনের দুটি গেট দিয়ে তারা পার্কে ঢুকছেন। সবাইকে রমনায় প্রবেশের আগে আর্চওয়ে দিয়ে তল্লাশি করে প্রবেশ করাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। শাহবাগ থেকে মৎস্যভবন রাস্তার দুই পাশের ফুটপাত ধরে শত শত মানুষ হাঁটছেন। তাদের সবার পরনে বৈশাখের পোশাক। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে কেউ কেউ ছবি তুলছেন। নিজেকে সেলফিবন্দি করতে ভুলছেন না তারা। কেউ আবার রোদের তীব্রতা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য সঙ্গে ছাতা নিয়ে এসেছেন।

এদিন রমনা বটমূলে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে বৈশাখী সাজ দেখা গেছে। নারীরা লাল-সাদা শাড়ি, কাচের চুড়ি, দুল-মালায় বাঙালিয়ানা সাজে সেজেছেন। পুরুষদের গায়ে শোভা পেয়েছে নানা রঙ-নকশার পাঞ্জাবি। শাড়ি–পাঞ্জাবির রঙে লাল-সাদার আধিক্য। শিশু-কিশোরদের পোশাকেও লাল-সাদার প্রাধান্য দেখা গেছে। অনেকের মাথায় শোভা পেয়েছে রজনীগন্ধা, বেলি ফুলের গাজরা। তারা রমনা বটমূলের ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠানের গান ও কবিতা আসরে যোগ দিয়েছেন।

এছাড়া শাহবাগ ও মৎস্যভবনের মাঝে ওভারব্রিজের পশ্চিম পাশে আরেকটি গেট করা হয়েছে। সেটি দিয়ে পার্কে প্রবেশকারীরা ঘোরা শেষে বের হচ্ছেন। তবে বের হওয়া মানুষের চেয়ে প্রবেশকারীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। তীব্র গরমে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষজনকে পুলিশের পক্ষ থেকে পানি সরবরাহ করতেও দেখা গেছে। পার্কজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে তারা বেশ তৎপর।
পুরান ঢাকার গ্রেন্ডএরিয়া থেকে বাবার সঙ্গে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান দেখতে এসেছে আয়শা ইসলাম (০৬)। বাংলানিউজকে সে বলে, বাবা, আমি ওয়ানে পড়াশোনা করি। সঙ্গে বৈশাখের অনুষ্ঠান দেখতে এসেছি। এত দিন টিভিতে দেখেছি, আজকে আমি এখানে এসেছি। ভালো লাগছে, অনেক আনন্দ লাগছে। অনেক মজা করব—ঘুরব, আইসক্রিম খাব, খেলনা কিনব, তারপর বাড়ি যাব।

রমনা বটমূলে এবারই প্রথম এসেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. মিলেনিয়াম রহমান। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে আজ এখানে এসেছি। ভালো লাগছে, আগে কখনো এত সুন্দর অনুষ্ঠান দেখিনি।
বর্ষবরণের আয়োজন ঘিরে পুরো রমনা পার্ক এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বসানো হয়েছে ডিএমপি ও র‍্যাবের কন্ট্রোল রুম। প্রবেশপথ ও বাহিরপথ আলাদা করা হয়েছে।



Our Like Page