সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ০৫:৪৩ অপরাহ্ন

সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়িতে দুর্ভোগ

রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত-যেদিকেই যাবেন চোখে পড়ে একই চিত্র। কোথাও রাস্তা কেটে ফেলে রাখা হয়েছে মাসের পর মাস, কোথাও উন্নয়নকাজের নামে সড়কের অর্ধেকজুড়ে পড়ে আছে মাটি, বালু ও নির্মাণসামগ্রী।

কোনো এলাকায় ভাঙাচোরা সড়কে সামান্য বৃষ্টিতেই তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, আবার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে পুরো আবাসিক এলাকা। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সরু হয়ে যাওয়া সড়কে বাড়ছে যানজট, কমছে চলাচলের গতি।
যানজট তো আছেই, জনজটও কম না। দিনের পর দিন এই দুর্ভোগ সহ্য করতে করতে ক্ষোভ জমেছে নগরবাসীর মধ্যে।
ধানমণ্ডি, উত্তরা, বারিধারা, নতুনবাজার, বসিলাসরেজমিন ধানমণ্ডি, উত্তরা, বারিধারা, নতুনবাজার, মোহাম্মদপুর ও আদাবরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জায়গায় রাস্তা কাটার পর নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা হয়নি। কোথাও ড্রেনেজ লাইনের কাজ, কোথাও বিদ্যুৎ বা ফাইবার অপটিক্যাল কেবল স্থাপনের কাজ, আবার কোথাও চলছে মেট্রো রেল-সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন।
 

কিন্তু কাজের গতি ধীর হওয়ায় জনভোগান্তি এখন চরমে।
উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরে ফুটপাত দখল ও অবৈধ পার্কিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খোঁড়াখুঁড়ির দুর্ভোগ। বারিধারা-নতুনবাজার এলাকায় উন্নয়নকাজের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। মোহাম্মদপুর, কাদেরাবাদ, কাঁটাসুর ও বসিলার বিভিন্ন সড়কে মাসের পর মাস ধরে পড়ে আছে খোঁড়া রাস্তা।

অনেক এলাকায় সড়ক সংস্কার না হওয়ায় বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের চলাচলও কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বয়হীন কাজের কারণেই একই এলাকায় বারবার রাস্তা কাটতে হচ্ছে। একটি সংস্থা কাজ শেষ করার আগেই আরেকটি সংস্থা এসে আবার সড়ক খুঁড়ছে। এতে একদিকে যেমন দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে সরকারি অর্থও।

বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোতে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত সিটি করপোরেশনের হলেও বাস্তবে সেই দায়িত্বের বড় অংশ এখন পালন করছে বিভিন্ন আবাসিক সোসাইটি।

নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স দিলেও নাগরিক সেবা পাচ্ছেন না তাঁরা। অনেক আবাসিক এলাকায় নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সুবিধার ঘাটতি পূরণে স্থানীয় সোসাইটিগুলোকে নিজেদের উদ্যোগে কাজ করতে হচ্ছে।

ধানমণ্ডিতে সেবার ঘাটতি পূরণ করছে সোসাইটি

রাজধানীর অন্যতম অভিজাত আবাসিক এলাকা ধানমণ্ডিতেও এখন নাগরিক দুর্ভোগের চিত্র স্পষ্ট। বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘদিন ধরে চলা খোঁড়াখুঁড়ি, অসমাপ্ত উন্নয়নকাজ, ফুটপাত দখল ও নিরাপত্তা সংকটে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও রাস্তা কাটার পর তা ঠিকমতো সংস্কার করা হয়নি, কোথাও উন্নয়নকাজের ধীরগতির কারণে চলাচলে তৈরি হয়েছে ভোগান্তি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে থাকা অনেক নাগরিক সেবাই এখন বাস্তবে পরিচালনা করতে হচ্ছে ধানমণ্ডি সোসাইটিকে। নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, ফুটপাত ব্যবস্থাপনা ও লেককেন্দ্রিক নানা সমস্যায় সোসাইটিকেই এগিয়ে আসতে হচ্ছে।

ধানমণ্ডির বাসিন্দা ড. নাবিদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি ও উন্নয়নকাজ দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক ও চিঠি চালাচালি হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও নাগরিক সেবার কিছু ঘাটতি নিজেদের উদ্যোগেই পূরণের চেষ্টা করছে ধানমণ্ডি সোসাইটি।’

স্থানীয়দের মতে, ধানমণ্ডির বিভিন্ন সড়কে এক সংস্থার কাজ শেষ হওয়ার আগেই আরেক সংস্থা এসে রাস্তা কাটছে। এতে একই এলাকায় বারবার দুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় রাস্তা কাটার পর দীর্ঘদিন সেটি সংস্কার না করায় ধুলা ও কাদার সমস্যা বাড়ছে।

বাসিন্দারা আরো জানান, ধানমণ্ডির মতো পরিকল্পিত এলাকায় নাগরিক সেবার এই দুরবস্থা হতাশাজনক। নিয়মিত ট্যাক্স দেওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

উত্তরাজুড়ে ভাঙাচোরা সড়ক, দখল আর যানজট

গত বৃহস্পতিবার উত্তরা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন লাইন স্থাপনের নামে সড়ক কেটে রেখেছে সিটি করপোরেশন। এসব কারণে সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে। ৩ নম্বর সেক্টরের ৪, ৫, ৬, ৯ ও ১৩ নম্বর সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ রাস্তাই ভাঙাচোরা। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা ও কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাস্তা সংস্কারের জন্য সিটি করপোরেশনকে বারবার চিঠি দিয়েও কোনো ব্যবস্থা পাইনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘সন্ধ্যার পর বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজট হয়। ফুটপাতের দোকান, রাস্তার দুই পাশে গাড়ি পার্কিং এবং বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ির কারণেই এই যানজট তৈরি হচ্ছে।’

১৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত ট্যাক্স দিচ্ছি, কিন্তু কোনো সেবাই পাচ্ছি না। প্রায় সব রাস্তাই ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা। অধিকাংশ ড্রেনের ঢাকনা নেই। ফলে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।’

জসিম উদ্দিন থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় ১৭ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, এক নম্বর মূল সড়ক প্রায় এক মাস আগে কেটে রাখা হয়েছে। রিকশাচালক হাসান আলী বলেন, ‘মাটির নিচ দিয়ে তার নেওয়ার জন্য রাস্তা কাটা হয়েছে। কাজ শেষ হলেও রাস্তা আর কার্পেটিং করা হয়নি। আগে ভালো রাস্তা ছিল, এখন প্রতিদিন জ্যাম লাগে।’

জসীমউদ্দীনের এক নম্বর সড়কের প্রায় অর্ধেকজুড়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে নির্মাণসামগ্রী ও বালু। একই চিত্র ৩, ৪, ৫, ১০, ১১ ও ১৭ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সড়কে।

১৭ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা মইনুল হক বলেন, ‘নির্মীয়মাণ কোনো ভবনেই সুরক্ষা বেষ্টনী নেই। এসব তদারকিতে কর্তৃপক্ষের কোনো ভূমিকা চোখে পড়ে না।’

একই সেক্টরের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ড্রেন না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যায়।’ আরেক বাসিন্দা ফুরকান মণ্ডল বলেন, ‘এখানে কোনো লাইটিং ব্যবস্থা নেই। রাত হলেই পুরো সেক্টর অন্ধকারে ডুবে যায়। এতে এলাকা মাদকসেবী ও অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।’

বারিধারা-নতুনবাজারে উন্নয়নকাজে অচল সড়ক

নদ্দা থেকে নতুনবাজারগামী সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, কোকা-কোলা পয়েন্ট পার হয়ে বারিধারার বাইরোডের বড় অংশ উন্নয়নকাজের কারণে প্রায় অচল। ১০০ ফিট মাদানি এভিনিউ, নতুনবাজারসংলগ্ন সড়ক, ভাটারা থানার সামনে ও ডিপিডিসি অফিসের সামনের এলাকায় চলছে খোঁড়াখুঁড়ি ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ। ফলে প্রতিদিনই যানজট, ধুলাবালি ও কাদায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে মানুষকে।

সড়কসংলগ্ন ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বারিধারার জে-ব্লকের এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী বলেন, ‘আগে শুধু বিকেলে যে বিক্রি হতো, এখন ২৪ ঘণ্টা খোলা রেখেও তা হচ্ছে না। রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি দাঁড়াতে না পারলে মানুষ আসবে কিভাবে?’

গুলশান ফার্নিচারের শোরুম ম্যানেজার সোহেল আহমেদ বলেন, ‘ব্যবসা লাটে উঠেছে। আড়াই লাখ টাকা ভাড়া দিয়েও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তা কাটার পর এই এলাকার সব দোকানের একই অবস্থা।’

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, একই এলাকায় এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-এর কাজ একসঙ্গে চলায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। এমআরটি-১-এর প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. সারওয়ার উদ্দীন খান বলেন, ড্রেনেজ পাইপ ও ১৩২ কেভি বিদ্যুৎ লাইন স্থানান্তরের কাজ শেষ না হওয়ায় বিলম্ব হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর-বসিলায় ধুলা, কাদা আর অসমাপ্ত সড়ক

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশের কাদেরাবাদ হাউজিং এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি সড়কে মাসের পর মাস ধরে উন্নয়নকাজ চলছে।

হাউজিংয়ের ৪ নম্বর সড়কের মাথায় আলু-পেঁয়াজ বিক্রেতা মো. শাহদাত হোসেন বলেন, ‘চার-পাঁচ মাস আগে রাস্তা কেটেছে সিটি করপোরেশন। এখনো কাজ শেষ হয়নি। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের চলাচলে খুব কষ্ট হচ্ছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইকবাল বলেন, ‘পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ট্যাক্স দিচ্ছি। অথচ এলাকার ১০ শতাংশ সড়কও কার্পেটিং করা হয়নি। শুকনা মৌসুমে ধুলা ওড়ে, আর বৃষ্টি হলে গর্তে পানি জমে যায়।’

চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের বাসিন্দা মো. রেজা বলেন, ‘এই হাউজিংয়ের বেশির ভাগ শাখা সড়ক এখনো কাঁচা। কোথাও মাটি, কোথাও বালু ফেলে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিনেও রাস্তা সংস্কার হয়নি।’

কাঁটাসুর এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট জুবায়ের আলম বলেন, ‘এই এলাকায় প্রায়ই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হয়। কিন্তু খোঁড়ার পর সেগুলো ঠিক করতে অনেক সময় লাগে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো-কোনো সমন্বয় নেই।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, রহিম ব্যাপারী ঘাট থেকে বটতলা পর্যন্ত প্রধান সড়কের কাজ তিন মাসেও শেষ হয়নি। মুদি দোকানি আসলাম পারভেজ বলেন, ‘রাস্তার কারণে চলাচলে ভোগান্তির পাশাপাশি ব্যবসায়ও ক্ষতি হচ্ছে।’

এদিকে বসিলা ওয়েস্ট ধানমণ্ডি হাউজিং এলাকার অধিকাংশ সড়কও ভাঙাচোরা। স্থানীয় বাসিন্দা মামুন হোসাইন বলেন, ‘বছরের পর বছর মাটি ও বালু ফেলে রাখা হয়েছে। প্রধান সড়কে প্রচুর ধুলা হয়। পুরো এলাকা ধুলায় আচ্ছন্ন থাকে।’

আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকাতেও দেখা গেছে একই চিত্র। বিভিন্ন সড়কে বড় বড় গর্ত ও ভাঙনের কারণে দুর্ভোগে পড়ছে স্থানীয়রা।

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন ভবন নির্মাণের কারণে পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ফাইবার অপটিক্যাল লাইনের জন্য নিয়মিত রাস্তা কাটতে হয়। বড় সমস্যা হয় যখন ওয়াসা, তিতাস, ডেসকো বা ডিপিডিসির মতো সংস্থাগুলো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।’

তিনি স্বীকার করেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে রাস্তা কাটার পর সংস্কারে সিটি করপোরেশনের গাফিলতি থাকে। অফিসারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সব রোড কাটিংয়ের কাজ দ্রুত শেষ করতে।’

তিনি বলেন, ‘বসিলা, বাড্ডা-মেরুল বাড্ডাসহ অনেক এলাকায় এখনো ইট-সুরকির রাস্তা রয়েছে। কিন্তু রাজস্ব কম আসায় সব জায়গায় একসঙ্গে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।’

রাস্তা কাটার অনুমতির বিষয়ে তিনি বলেন, “এখন আমরা পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে অনুমোদন দিচ্ছি। কোনো সংস্থা একটি কাজ ঠিকভাবে শেষ করলে তারপর পরবর্তী কাজের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’-এর মাধ্যমে কাজগুলো দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।”
সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ 



Our Like Page