এশিয়ান গেমস বাছাই খেলতে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে নারী হকির বাছাই পর্ব। এই টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে রচিত হতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায়।
প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় নারী হকি দল। ৮ দলের এই লড়াই থেকে শীর্ষ চার দল পাবে এশিয়ান গেমসের টিকিট।
ঐতিহাসিক এই যাত্রায় বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্পিতা পাল। অ্যাথলেটিক্স দিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে পা রাখা অর্পিতা এখন স্টিক আর বলের জাদুতে বুঁদ।
বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে দেশের প্রথম নারী জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে নিজের প্রস্তুতি, দলের অবস্থা এবং হকির প্রতি ভালোবাসার কথা বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট আবির রহমানকে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলানিউজ: আপনার হকিতে আসা কীভাবে? মানে হকিটা শুরু করলেন কীভাবে?
অর্পিতা পাল: প্রথমে আমি হকি খেলতাম না, অ্যাথলেটিক্স খেলতাম।
আমি যে স্কুলে পড়তাম, সেখানকার স্যার বলেছিলেন, যেহেতু অ্যাথলেটিক্সে ভালো, তাই বাকি গেমসেও ভালো করতে পারব। সে জন্য কয়েকদিন হকি প্র্যাকটিস করেছিলাম। এরপর দিনাজপুরে আমার যে কোচ আছেন, উনি বিকেএসপির কথা বললেন। জানালেন, ওখানে থাকলে পড়াশোনাও ভালো হবে, খেলাধুলার দিকটাও দেখতে পারব। এরপর বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিই এবং টিকে যাই। পরে ভর্তি হয়ে ২০২০ সাল থেকে আমি পার্মানেন্টলি বিকেএসপিতে আছি।
বাংলানিউজ: আপনি হকি আর অ্যাথলেটিক্স ছাড়া আর কী কী গেম খেলেছেন?
অর্পিতা পাল: ফুটবল, বাস্কেটবল, হ্যান্ডবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স খেলেছি। তবে পরে হকিটায় আসা। এর পেছনের কারণ হলো, হকি হচ্ছে একটা স্কিল, একটা আর্ট। এটার মধ্যে এমন কিছু আছে, কেউ যদি মন দিয়ে খেলে, সে কখনো ছাড়তে পারবে না। যখন আমরা মাঠে নামি, স্টিকের প্রতি, বলের প্রতি যে একটা ভালোবাসা তৈরি হয়, স্টিক আর বলের সঙ্গে যখন ভালো আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে যায়, তখন আর মন চায় না স্টিকটা হাত থেকে নামাই। যতটুকু সময় প্র্যাকটিসে থাকি, সবসময় স্টিক-বলের সাথেই থাকি। রুমে গেলেও মাথায় ঘোরে কীভাবে কী করলে খেলাটা আরেকটু ভালো হবে, টিমটাকে আরেকটু এগিয়ে নিতে পারব। হকি নিয়ে ভাবতে ভাবতে এখন এটার প্রতি একটা ভালোবাসা চলে এসেছে, যে কারণে এটা আর ছাড়তে মন চায় না।
বাংলানিউজ: বিকেএসপিতে পাঁচ বছর পার্মানেন্ট হওয়ার পরই বড় অ্যাচিভমেন্টের দ্বারপ্রান্তে আপনি। আপনাকে অধিনায়ক করেই জাতীয় দল গঠন করা হলো। অথচ যখন শুরু করেছিলেন, তখন তো হকির জাতীয় দল হবে কি না সেটাই নিশ্চিত ছিল না। এটা কি আপনাকে ভাবাতো?
অর্পিতা পাল: না, এটা তো কখনো ভাবার মতোই ছিল না। আমি যখন প্রথম আসি, তখন আমি ছিলাম এই ন্যাশনাল ক্যাম্পের সবচেয়ে ছোট। তখন সব আপুদের দেখতাম, আমাদের ক্যাপ্টেন ছিল রিতু খানম আপু। উনি সবাইকে লিড দিতেন। তখন মনে হতো, আমি কি কখনো এমন হতে পারব? পরে গেম খেলতে খেলতে, একটা রুটিনের মধ্যে থেকে প্র্যাকটিস করতে করতে আজকের এ পর্যন্ত আসা এবং দেশের প্রথম জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া। বিকেএসপির প্র্যাকটিস পেয়েই বলতে গেলে আমি এতটা উন্নতি করতে পেরেছি বা পারফরম্যান্স ধরে রাখতে পেরেছি। যে কারণে হয়তোবা আজ ন্যাশনাল টিমের কোচ আমাকে অধিনায়ক হিসেবে সিলেক্ট করেছেন।
বাংলানিউজ: হকি স্কিলের খেলা হলেও, ইনজুরি হওয়ারও চান্স থাকে। শুরুতে ভয় লাগত না?
অর্পিতা পাল: না, এখন অব্দি এ রকম কোনো ভয় কাজ করেনি। আমাদের বিকেএসপিয়ান যারা আছে, তাদের জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট হলো—কখনো কোনো ইনজুরিতে পড়লে সেখানে মেডিকেল ব্যবস্থা আছে। এমনকি বড় কোনো ইনজুরি হলেও বিকেএসপিতে ইন্স্যুরেন্সের সুবিধা আছে, চিকিৎসার জন্য একটা অ্যামাউন্ট দেওয়া হয়। যে কারণে ইনজুরি নিয়ে কখনো কোনো ভয় হয়নি।
বাংলানিউজ: প্রথমবারের মতো হকি নারী দল গঠন করা হয়েছে, আর সেই ঐতিহাসিক দলের অধিনায়ক আপনি। অনুভূতি কেমন?
অর্পিতা পাল: অনুভূতি ভালো। আর অধিনায়ক বানানোর যে বিষয়টা স্যাররা হয়তোবা মনে করেছেন যে আমি টিম হ্যান্ডেল করতে পারব বা আমার মধ্যে সেরকম কিছু আছে, সেই জন্যই আমাকে অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচন করেছেন। তো এখন যেহেতু আমার ঘাড়ে দায়িত্ব পড়েছে, তাই আমাকে আমার টিম সামলাতে হবে। কীভাবে টিমটাকে একটা ভালো পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, কীভাবে সবার পারফরম্যান্স বাড়াতে হবে, কীভাবে সবাইকে হ্যান্ডেল করতে হবে..এগুলো এখন আমাকে দেখতে হবে।
বাংলানিউজ: সতীর্থদের নিয়ে যদি বলতেন?
অর্পিতা পাল: দলের ম্যাক্সিমামই বিকেএসপির খেলোয়াড়। বর্তমান স্টুডেন্ট আছে ১৪ জন, আর ১৮ জনের মধ্যে দুজন আমাদের এক্স-বিকেএসপিয়ান। ধরতে গেলে ১৬ জনই বিকেএসপি থেকে জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করছে। যে কারণে আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং মোটামুটি ভালোই। আর বাইরের যে দুজন আছেন, তারাও এই কয়েকদিন ক্যাম্প করে আমাদের সঙ্গে অনেকটাই অ্যাডজাস্ট করে ফেলেছেন। আমরা বিকেএসপির বা ওনারা বাইরের, এমন কোনো বিষয় নেই। এখন ওনারা আমাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমরা সবাই এক হয়ে গেছি। সবার পারফরম্যান্স এখন বেশ ভালো।
বাংলানিউজ: জাকার্তায় কোয়ালিফায়িং রাউন্ড খেলতে যাচ্ছেন। প্রস্তুতি কেমন নিয়েছেন?
অর্পিতা পাল: আমরা বিকেএসপিতে থেকেই অনুশীলন করেছি। তবে বাইরের কোনো টিমের সঙ্গে আমরা ম্যাচ খেলতে পারিনি। সেটা খেলতে পারলে হয়তো ভিন্ন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারতাম। কিন্তু আমাদের কোচ বিকেএসপির ছেলে হকি টিমের বিপক্ষে আমাদের ম্যাচ খেলিয়েছেন, যেন আমরা নিজেদের আরও ডেভেলপ করতে পারি। এই দিক থেকে আমরা কিছুটা কনফিডেন্স পেয়েছি যে, ছেলেদের সঙ্গে যদি আমরা এভাবে খেলতে পারি, ভালো করতে পারি, তাহলে দেশের বাইরে গিয়ে মেয়েদের সাথেও নিশ্চয়ই ভালো করব।