বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও বরিশাল বিভাগের প্রধান সড়ক সংযোগ হিসেবে পরিচিত ঢাকা–বরিশাল মহাসড়ক। পদ্মা সেতু এবং ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে সরাসরি সংযুক্ত এই রুটটি যাত্রাবাড়ী থেকে শুরু হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত বিস্তৃত।
কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যানবাহনের চাপ এবং নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলের কারণে এই মহাসড়ক এখন ক্রমেই পরিণত হচ্ছে এক ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ পথে—যেখানে প্রতিনিয়ত ঝরছে প্রাণ, ভেঙে পড়ছে অসংখ্য পরিবার।
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা–বরিশাল রুটে যাতায়াত সময় কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। কিন্তু সেই সঙ্গে কয়েকগুণ বেড়েছে যানবাহনের চাপ।
বর্তমানে মহাসড়কটির বড় অংশই দুই লেনের। সরু রাস্তা, হঠাৎ বাঁক, অসম্পূর্ণ উন্নয়ন কাজ এবং বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত যানবাহন ও সীমিত অবকাঠামোর এই বৈপরীত্যই দুর্ঘটনার মূল কারণগুলোর একটি।
উৎসবকে কেন্দ্র করে এই মহাসড়কের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। পরিবারে ফেরার তাড়না, সময় বাঁচানোর চাপ এবং চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা—সব মিলিয়ে বেপরোয়া গতির প্রবণতা বাড়ে।
ফলে আনন্দযাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয় শোকযাত্রায়।
৩ মার্চ। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে দোল উৎসব উদযাপন করতে মোটরসাইকেলে রওনা হয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মী প্রান্ত মন্ডল। গন্তব্য বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার রূপধন গ্রাম।
ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে উজিরপুরের ইচলাদি এলাকায় পৌঁছালে একটি কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ২৪ বছর বয়সী প্রান্ত।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এক সপ্তাহেই একই মহাসড়কে তিনটি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের ভূরঘাটা থেকে বাবুগঞ্জ উপজেলার নতুনহাট পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার অংশে অন্তত পাঁচটি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
* গৌরনদী বাসস্ট্যান্ড,
* ইল্লা,
* কটকস্থল,
* উজিরপুরের সোনারবাংলা,
* রামগতি,
এছাড়া বার্থী, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোর, মোড়াকাঠি, সানুহার, জয়শ্রী ও ইচলাদি এলাকাও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
এই অংশজুড়ে সড়কের পাশে ডোবা, খাল ও নালার উপস্থিতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পদ্মা সেতু চালুর পর এই রুটে বেড়েছে ফিটনেসবিহীন ও রুট পারমিটবিহীন যানবাহনের সংখ্যা।
উৎসব’র সময় ঢাকার বাসগুলো হঠাৎ করে এই রুটে নেমে পড়ে—যাদের অনেক চালকেরই মহাসড়ক সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই।
এক পরিবহন কর্মকর্তা বলেন,
“অভিজ্ঞ চালকরাও অনভিজ্ঞ ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনায় পড়ছেন।”
এছাড়া থ্রি-হুইলার, নসিমন, করিমন ও ভটভটির মতো ধীরগতির ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
মহাসড়ক পুলিশ ঈদকে সামনে রেখে টহল ও মোবাইল টিম বাড়ানোর কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—এটি কি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান?
গৌরনদী মহাসড়ক থানার এক কর্মকর্তা সরাসরি স্বীকার করেন,
বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
তার ভাষায়,
“মহাসড়ক চার লেন না করা হলে দুর্ঘটনা কমানো যাবে না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি বহুমাত্রিক—
* সড়ক প্রশস্তকরণ (কমপক্ষে ৪–৬ লেন)
* অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ
* চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং কঠোর করা
* ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রকৌশলগত সংস্কার
* কার্যকর ট্রাফিক আইন প্রয়োগ
ঢাকা–বরিশাল মহাসড়ক শুধু একটি সড়ক নয়—এটি দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১০টি জেলার মানুষের জীবনরেখা। বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুর, বরগুনা, ঝালকাঠি, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের অর্থনীতি, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই রুট।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এটি যেন এক অনিরাপদ যাত্রাপথ—যেখানে প্রতিটি যাত্রাই অনিশ্চয়তায় ভরা।
প্রশ্ন এখন একটাই: উন্নয়নের এই মহাসড়ক কি মানুষের জীবন রক্ষা করবে, নাকি এভাবেই চলতে থাকবে মৃত্যুর মিছিল?
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দাবি স্পষ্ট—
“মরণফাঁদ নয়, আমরা চাই নিরাপদ ও আধুনিক মহাসড়ক।”