রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩১ অপরাহ্ন

‘বিশেষ’ ক্ষমতার বলি শিশুরা!

হঠাৎ করে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশুমৃত্যুর মিছিলের মূল কারণ কী? এটা কি শুধুই টিকার ঘাটতি? নাকি এর সঙ্গে আরো কিছু?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ‘বিশেষ ক্ষমতা’র একচেটিয়া সিদ্ধান্তের বলি হচ্ছে শিশুরা। এই বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের স্বাস্থ্য খাতে ‘বিশেষ’ ক্ষমতা ও একচেটিয়া আধিপত্য।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ধারাবাহিক বৈঠকগুলোর অধিকাংশতেই তিনি সভাপতিত্ব করেন। ওপি বাতিল ও সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে তিনিই সবচেয়ে জোরালোভাবে ধাক্কা দিয়েছিলেন।
 

কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করেছিলেন, জনবলের বেতন বন্ধ, টিকা সরবরাহ ভেঙে পড়া, অর্থায়ন ঝুঁকির কথা তুলেছিলেন। কিন্তু ডা. সায়েদুর রহমানের অবস্থান ছিল অটল।

 

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. ইউনূসের উপদেষ্টা পরিষদে সবচেয়ে ‘বাজে চয়েস’ বলা হতো স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে। দায়িত্ব বণ্টনের কিছুদিন পর ড. ইউনূসও সেটি বুঝতে পারেন এবং মন্ত্রণালয়টি যথাযথভাবে চালাতে উপদেষ্টা পদমর্যাদায় একজন বিশেষ সহকারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

 

এরপর সেই পদে বসানো হয় অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানকে। এর পর থেকে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সব নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন তিনি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমেরও কিছুটা চাপা ক্ষোভ ছিল।

সেই সময় স্বাস্থ্য উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ এক চিকিৎসক ও এনসিপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিশেষ সহকারী পদে সায়েদুর রহমানকে নিয়োগের পর থেকে তিনিই স্বাস্থ্যের ওয়ান ম্যান আর্মির মতো সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন।

বদলি-পদায়নসহ স্বাস্থ্য খাতের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং কাজ তিনিই বাস্তবায়ন করতেন। এমনকি তাড়াহুড়া করে ওপি বাতিল করার ব্যাপারেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।’

তিনি আরো বলেন, “ডা. সায়েদুর রহমানের ‘বিশেষ ক্ষমতা’র কারণে বৈঠকে কেউ আর বেশি কথা বলতে সাহস পেতেন না। তিনি বারবার বলতেন, ডুপ্লিকেশন আর জবাবদিহির ঘাটতির কারণে সেক্টর প্রোগ্রাম দুর্বল। কিন্তু আমরা যখন বলতাম, বিকল্প কাঠামো তৈরি না করে হঠাৎ বের হলে সেবা থেমে যাবে, তখন তিনি শুনতেন না। ফলে আজ দুই শতাধিক শিশু তাঁর সিদ্ধান্তের বলি।”

ওপি বাতিলে সতর্কতা শোনা হয়নি

২০২৫ সালের ৬ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পঞ্চম স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির এক্সিট প্ল্যান বিষয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ওই বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। সেই সভার কার্যবিবরণী নথির একটি কপি এসেছে কালের কণ্ঠের হাতে। সেটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি দপ্তরই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তাগুলো কার্যকর নীতিতে প্রতিফলিত করা হয়নি বলেই এখনকার সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সভায় স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান জানান, চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর থেকেই পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে কর্মরত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। জুলাই ২০২৪ থেকে এখন পর্যন্ত যাঁরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন, তাঁদের বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে। শুধু জনবল নয়, জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত পণ্য সরবরাহকারীদের বিলও পরিশোধ করা যায়নি। এই অবস্থায় যদি নতুন কাঠামোয় যাওয়া হয়, তাহলে সেবার ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

একই বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) বলেন, ‘অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় ১৪টি ওপিতে কর্মরত জনবল দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা চালু রেখেছিরলেন। হঠাৎ করে এই জনবল বাদ পড়লে রাজস্ব খাতের সীমিত জনবল দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।’ তাঁর মতে, ‘এটি শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, এটি সরাসরি সেবা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।’

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বাজেটসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সভায় বলেন, সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বের হওয়ার আগে ভ্যাকসিন ক্রয় ও রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো না হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও গবেষণা বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘প্রতিরোধমূলক ভ্যাকসিন ও ওষুধকে অগ্রাধিকার দিয়ে রাজস্ব বাজেট থেকে দ্রুত ক্রয়ের ব্যবস্থা না করলে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ব্যাহত হবে। টিকা কার্যক্রমে সামান্য গ্যাপও বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে।’

এ ছাড়া এইডস ও এসটিডি বিভাগের পরিচালক বলেন, যক্ষ্মা ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এখনো উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এই কাঠামো ভেঙে গেলে নতুনভাবে সমন্বয় না করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

যানবাহন থেকে জ্বালানি-সবই অনিশ্চিত

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগ জানায়, ওপির আওতায় সংগৃহীত শত শত যানবাহন এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু জুলাই ২০২৪ থেকে এসবের জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকের বেতন বাবদ কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়ে বলে, তাদের অধীনে কর্মরত জনবল, গাড়ি ও কার্যক্রম চালাতে নির্দিষ্ট বরাদ্দ না থাকলে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সভায় কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট জানায়, তাদের অধীনে কর্মরত ১৪ হাজারের বেশি জনবলের বড় অংশ রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হলেও তাঁদের বেতন পরিশোধে এখনো ঘাটতি রয়েছে। বাকি জনবল সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

সভায় বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি বলেন, পঞ্চম সেক্টর প্রোগ্রামের জন্য শত শত মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলমান ছিল। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মসূচি অনুমোদন না হলে এই অর্থায়ন প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু করতে হবে, যা দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করবে এবং অর্থছাড় বিলম্বিত হবে। এমনকি এটি স্বাস্থ্য খাতের অর্থায়নে বড় ধাক্কা দিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

তবে মন্ত্রণালয়ের ভেতরের একটি অংশের কর্মকর্তারা ভিন্নমতও দেন। তাঁদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করতে সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সেটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং প্রস্তুতির অভাবই বর্তমান সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডা. মনজুরের বিস্ফোরক তথ্য

দেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ওপি বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে চরম ‘হঠকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের ফোকাল পারসন ডা. মনজুর আহমেদ বলেন, নীতিনির্ধারকদের চরম উদাসীনতা এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবিকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। ওপি বন্ধের ফলে বর্তমানে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং সাপ্লাই চেইন পোর্টালে এখন ‘সব লাল’ সংকেত দেখা দিচ্ছে।

ডা. মনজুর আহমেদ জানান, অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর দীর্ঘ ২৬ বছরের (১৯৯৮-২০২৪) সফল ওপি ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে যখন দুই বছরের প্রকল্প (ডিপিপি) ভিত্তিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের কোনো পাত্তাই দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করি, সে ক্ষেত্রে আমাদের যে চাহিদা এবং কার্য ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রস্তাব ছিল, তা কোনোভাবেই আমলে নেওয়া হয়নি।’

এই কর্মকর্তা আরো জানান, কর্মকর্তাদের বারবার দেওয়া সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই এই নীতি পরিবর্তন করা হয়েছে, যা বর্তমান সংকটের মূল কারণ। সরবরাহব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে ডা. মনজুর বলেন, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টালে ঢুকলে দেখা যাবে সবকিছু এখন ‘লাল’ হয়ে আছে, যার অর্থ মজুদে এক ভয়াবহ শূন্যতা বিরাজ করছে। পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর জন্য যেখানে অন্তত ছয় মাসের ‘বাফার স্টক’ থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে বর্তমানে বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্লান্ট ও আইইউডির মতো অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর কোনো সংগ্রহই নেই। তিনি বলেন, ‘সহজ কথা বলে দিই, আপনি খালি দুটি অক্ষর লিখুন—সব লাল।’

ওপি বন্ধের ফলে সৃষ্ট এই শূন্যতা কেবল সেবারই ক্ষতি করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। ডা. মনজুরের মতে, সরবরাহব্যবস্থায় এক মাসের বিঘ্ন ঘটা মানে বিশাল বিনিয়োগ হারানো। এক ডলারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া মানে ইনভেস্টমেন্টে আমাদের ১৪ ডলারের লোকসান গ্রহণ করা।’ অথচ নীতিনির্ধারকদের অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের কারণে আজ এই জাতীয় ক্ষতি অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা বৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা সরকারের রয়েছে, তা-ও এখন অনিশ্চিত। কারণ হিসেবে তিনি জানান, সেবার জন্য দক্ষ জনবল (মিডওয়াইফ) নিয়োগের প্রক্রিয়াগুলোও এই প্রশাসনিক রদবদলের কারণে সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না।

 ‘ওপি বন্ধেই ইপিআইয়ের কাজে ভাঙন’

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. রাজীব সরকার জানান, টিকাদান কর্মসূচির সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্রচলিত ওপি হঠাৎ বাতিল করা। আগে এর আওতায় টিকা কেনা ও বাজেটের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো ছিল, যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তদারকি করত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার হঠাৎ করেই অন্যদের সহযোগিতা ছাড়া নিজেদের ভ্যাকসিন নিজেরাই কেনার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ‘ডিপিপি’ (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পদ্ধতিতে অর্থ বরাদ্দের পরিকল্পনা করে। এই রূপান্তরের সময় কোনো কার্যকর ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ছেদ পড়ে, যা পুরো কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। অর্থায়নে বড় ছেদ পড়ে।

হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগ। একটি আক্রান্ত শিশু বাতাসের মাধ্যমে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। নিয়মিত টিকায় প্রথম ডোজ ৮৫ শতাংশ কার্যকর, দ্বিতীয় ডোজের পরও ৫ শতাংশ অরক্ষিত। দেশে ২০ শতাংশ শিশু দ্বিতীয় ডোজ পায় না। এই গ্যাপ জমে বড় অরক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে। তবে সংকট আরো গভীর হয়েছে জনবলসংকট ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনের কারণে। চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর থেকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের হাজার হাজার কর্মী বেতন পাচ্ছেন না। মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য সহকারীরা গ্রেড উন্নীতকরণের দাবিতে অন্তত তিনবার ধর্মঘট করেছেন। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক শিশু টিকা পায়নি।

কমিউনিটি ক্লিনিকের ১৪ হাজার জনবলের বেতন ঘাটতি রয়েছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানিয়েছে, জনবল ও গাড়ি চালাতে বরাদ্দ না থাকলে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। প্রশাসন বিভাগ বলেছে, ওপির যানবাহনগুলো মাঠে চলছে, কিন্তু জ্বালানি-রক্ষণাবেক্ষণের টাকা নেই। ডা. রাজীব সরকার বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলনও সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। গ্যাভির দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হয়ে টিকাদান কর্মসূচি থেমে গেছে।’

মুখ খুলছেন স্বাস্থ্যের সাবেক কর্মকর্তারা

দেশের স্বাস্থ্য খাতের স্থবিরতা এবং ওপি বন্ধ হওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য কর্মসূচি সচল রাখতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অপরিহার্য। হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে মাঠ পর্যায়ের সেবা বিঘ্নিত হয়।

তিনি জানান, চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম কর্মসূচির আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে ১৪টি অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হতো। তবে এই প্রক্রিয়ায় স্থায়ী জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি না পাওয়ার অজুহাতে কার্যক্রমগুলো মূল কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার একটি প্রস্তাব বা আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু সরকারের স্বাস্থ্য কর্মসূচি সচল রাখতে হলে হঠাৎ করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাওয়া যায় না; এটি একটি ধারাবাহিকতার বিষয়। নীতিনির্ধারণী বিষয়ে অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মূলত নীতিনির্ধারণের কাজ করে থাকে আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সেই সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করে। ওপি বন্ধের এই সিদ্ধান্তকে ‘হঠকারী’ বললেও ডা. হানিফ প্রশাসনিক কাঠামোর দোহাই দিয়ে সরাসরি কাউকে দায়ী করতে নারাজ। তবে তিনি স্বীকার করেন যে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক গভীরে পড়ে।

‘একক ও হঠকারী সিদ্ধান্ত’ দায়ী

ওপি বন্ধ করে দেওয়ার পেছনে তৎকালীন বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমানের (খসরু) ‘একক ও হঠকারী সিদ্ধান্ত’ কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী। তাঁর মতে, তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও পারদর্শিতা না থাকায় পুরো বিষয়টি ডা. সায়েদুর রহমানের একক মেধায় পরিচালিত হয়েছে, যা বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।

অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের জানান, ওপি পদ্ধতিতে কেনাকাটা ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হতো। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দ্রুত কাজ করা যেত। কিন্তু বর্তমানে ওপেন টেন্ডার মেথডে যাওয়ার ফলে একটি কাজ শেষ করতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যাচ্ছে, যা জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোটেও উপযোগী নয়।

আবুল খায়ের বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটা খসরু ভাইয়ের একক একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত। নূরজাহান বেগম এই বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন না বলে ডা. সায়েদুর রহমানই প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।’

মুখ খুলছেন না ‘দায়ী’ ব্যক্তিরা

দেশের টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট ধোঁয়াশা এবং দায় প্রসঙ্গে সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। বারবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময়ে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত একজন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খোঁজ করে জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে উনি এই বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে শিগগিরই একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা ‘রিজয়েন্ডার’ দেওয়া হতে পারে, তবে তার আগপর্যন্ত এই নীরবতা ভাঙতে নারাজ তাঁরা।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র মারফত জানা গেছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশ রয়েছে এই মুহূর্তে গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য না দেওয়ার জন্য। সূত্রটি বলে, ‘চিফ স্যার (ড. ইউনূস) বলেছেন, ‘একবারে সব গোছগাছ করে তারপর আমরা কথা বলব।’” তাঁরা জানান, বর্তমানে তাঁদের কাছে প্রতিটি বরাদ্দের বিপরীতে দাপ্তরিক চিঠি ও প্রমাণাদি সংরক্ষিত আছে। যদিও তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা রোধে তাঁরা আপাতত বিচ্ছিন্নভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। সব তথ্য-উপাত্ত গুছিয়ে শিগগিরই একটি সমন্বিত ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করা হবে।

তাঁরা আরো দাবি করেন, কেন্দ্রীয় ভাণ্ডার থেকে যখন জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে টিকা পাঠানো হয়, তখন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে স্টক কিছুটা কম দেখালেও মাঠ পর্যায়ে টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল। কিছু বিচ্ছিন্ন এলাকায় সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে তা পার্শ্ববর্তী ইউনিট থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে।

ভুলে গেছেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা!

এসব বিষয়ে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি। বিশ্বস্ত অন্য আরেকটি সূত্রে তাঁর সঙ্গে টিকার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি সূত্রকে বলেন, ‘এসব ঘটনা বেশ আগের হওয়ায় এবং তিনি অসুস্থ থাকায় এগুলো তিনি ভুলে গেছেন।’



Our Like Page