কেবল আব্দুর রহমানই নন, তার মতো আরও অনেকেই তেল কিনতে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। এতে করে তাদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। অনেকে তেল কেনার জন্য নিজের কাজে যেতে পারেননি অথবা ছুটি নিয়েছেন। অন্যদিকে তেলের দাম বাড়ায় আগের চেয়ে কম তেল পাচ্ছেন তারা।
সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনে কথা হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কামাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, তিনি ফুয়েল পাস দিয়ে ১০০০ হাজার টাকার তেল নিয়েছেন। এই টাকায় আগে ৮ লিটারের একটু বেশি তেল পেতেন। এখন ৭ লিটারের কম পেয়েছেন।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ধানমন্ডির বাসিন্দা শফিকুর রহমান। আর তেল পেয়েছেন বিকেল ৩টায়। তিনি বলেন, সেই সকাল সাড়ে ৭টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। কিনেছেন ৮০০ টাকার তেল। দাম বাড়ায় তেলও কম পেয়েছেন।
অন্যদিকে প্রাইভেটকারের লাইনও ছোট ছিল না। প্রাইভেটকারগুলোকে ২০০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। সেখানে একজন চালককে পাম্পের কর্মীর সঙ্গে তর্ক করতে দেখা যায়। একটু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে সেই চালক জানান, তিনি ২০০০ টাকার তেল নিয়েছেন, যা ১৪ লিটারের কিছুটা বেশি। তিনি আরও ২৪০ টাকার তেল নিতে চান। কিন্তু পাম্প কর্তৃপক্ষ দিচ্ছে না। তিনি বলেন, ২০০০ টাকায় আগে ১৬ লিটারের মতো তেল পেতাম। এখন দাম বাড়ায় কম তেল পাচ্ছি।
ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোটরসাইকেলগুলোকে ১০০০ ও প্রাইভেটকারগুলোকে ২০০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। কারণ ভিড় বেশি। কিন্তু আমাদের হাতে তেল সীমিত। কাউকে অতিরিক্ত তেল দেওয়ার সুযোগ নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, তেলের দাম বাড়লেও তেলের লাইনে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি। বরং লাইন আরও লম্বা হচ্ছে। সোনার বাংলা সার্ভিস স্টেশনের তেলের লাইন আসাদগেট ছাড়িয়ে আসাদ এভিনিউ দিয়ে ঢুকে আনসার ভবন পেরিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার চলে গেছে। এছাড়া এলিফ্যান্ট রোডের রহমান অ্যান্ড কোংয়ের সামনেও তেলের লম্বা লাইন দেখা যায়, যা কাটাবন মোড় ছাড়িয়ে যায়। নীলক্ষেতের কিউ জি সামদানী ফিলিং স্টেশনেও লম্বা লাইন দেখা যায়। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারগুলো রাস্তার অর্ধেক দখল করে আছে। ফলে রাস্তায় কৃত্রিম যানজটের সৃষ্টি হয়। তবে নীলক্ষেত মোড় সংলগ্ন পথের বন্ধু ফিলিং স্টেশন বন্ধ পাওয়া যায়।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে এবার দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাল। শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ঘোষণা করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
এতে বলা হয়, প্রতিলিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন দাম রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে কার্যকর হচ্ছে।
এলিফ্যান্ট রোডের রহমান অ্যান্ড কোং থেকে তেল নিতে আসা বাইকার আল-আমিন হোসেন রাজু বলেন, তেল কিনতে সকাল থেকে লাইনে বসে আছি। আমার সামনে হয়তো আরও ৫০ জন আছে। এই ৫০ জন পেরিয়ে কখন তেল পাবো ঠিক নেই। এদিকে আবার তেলের দাম বাড়ায় আগের চেয়ে তেল কম পাবো। হয়তো এই দিনেরই অপেক্ষা করছিল মজুতদার চক্র।
কিউ জি সামদানী ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা আরেক বাইকার জাফর ইকবাল বলেন, আজকে অফিস থেকে হাফ বেলা ছুটি নিয়েছি। পরিবারের সঙ্গে সময় না কাটিয়ে পুরোটা সময় তেলের লাইনেই কাটালাম। হাফ বেলাও শেষের পথে। কিন্তু তেল কখন পাবো জানি না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে। বিশ্ববাজারে দামও বাড়ে জ্বালানি তেলের। এক পর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৮০ ডলারের আশপাশে। ১৭ এপ্রিল জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। এতে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। তবে ইরান ১৮ এপ্রিল আবার হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এরই মধ্যে ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা এলো। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ শুরু করে সরকার। সে হিসাবে আগের মাসে আমদানি করা জ্বালানি তেলের খরচ বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে নতুন দাম সমন্বয় করা হয়। তবে বিশ্ববাজারে ব্যাপক বাড়লেও এবার এপ্রিলের শুরুতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। এখন মাসের মাঝামাঝি এসে