সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, সাবেক সংসদ সদস্য
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠসরকারের কিছুটা রক্ষণশীল মনোভাব এবং সরকার-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এবারের বৈশাখী আয়োজন তুলনামূলক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল। মানুষের মনের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও প্রকাশের জায়গাটি কখনো দীর্ঘদিন সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।
বড় বড় অনুষ্ঠানে অনেক মানুষের ভিড়ে ব্যক্তিগতভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ হয় না, কিন্তু আজকের এই আয়োজনে আমরা একে অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলতে পেরেছি, কুশল বিনিময় করতে পেরেছি, এটি অত্যন্ত আনন্দের। কালের কণ্ঠ শুধু আজ নয়, বরাবরই সাহসী সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়েছে।
হাজার বছরের সংস্কৃতির শক্তি ও আগামীর প্রেরণা
রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআমার শৈশবে বৈশাখ মানেই ছিল বাবার হাত ধরে মেলায় যাওয়া। তখন প্রধান আকর্ষণ ছিল দুটি—হালখাতা এবং গ্রামীণ মেলা। এর পাশাপাশি ছিল গানের আসর। বৈশাখের সেই চিরায়ত আমেজ আজও গ্রামীণ জনপদে, এমনকি সুন্দরবনের গহীন বনেও খুঁজে পাওয়া যায়।
যদিও নগরায়ণের ফলে শহরের উৎসবে সেই পুরনো আদল কিছুটা বদলেছে, কিন্তু প্রাণের স্পন্দন রয়ে গেছে আগের মতোই।
নগরায়ণের প্রলেপে পহেলা বৈশাখ অনেক সময় ক্ষমতার কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। আমি লক্ষ করেছি, ক্ষমতার শীর্ষে যখন যারা থাকে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় মধ্যবিত্ত সমাজকে তাড়িত করে। অগণতান্ত্রিক পরিবেশে কবি-সাহিত্যিকরা তাঁদের গান ও কবিতার মাধ্যমে প্রতিবাদী আমেজ ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বা যখন কোনো দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি মাথাচাড়া দেয়।
অন্তর্বর্তী জামানায় ‘মব জাস্টিস’-এর আতঙ্ক যোগ হয়েছিল
গোলাম মওলা রনি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠড. ইউনূসের জামানায় এসে বৈশাখের সেই আনন্দময় স্মৃতিগুলোতে সাম্প্রদায়িকতা, মাজার ভাঙা আর ‘মব জাস্টিস’-এর আতঙ্ক যোগ হয়েছিল। আমি শুরুতে মব বা জেন-জিদের অতটা ভয় পেতাম না, ভেবেছিলাম তারা আমাকে সম্মান করবে। এমনকি জামায়াতের সঙ্গেও আমার সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু দুটি ঘটনায় আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এক, যখন দেখলাম ফজলুর রহমান সাহেবের বাসার সামনে মব হচ্ছে আর রাষ্ট্র অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছে। দুই, মঞ্জুরুল আলম পান্নাদের ওপর যে আক্রমণ হলো, সেই অনুষ্ঠানে আমারও যাওয়ার কথা ছিল। আমি না যাওয়ায় হয়তো আজ অক্ষত আছি; আমার বাবা-মা নিশ্চয়ই কোনো ভালো কাজ করেছিলেন, যার ফলে আমি বেঁচে গেছি।
সেই বিভীষিকা কাটিয়ে এ বছর যে বৈশাখ এসেছে, তা অভাবনীয়। ঢাকা শহরে মানুষের যে ঢল নেমেছে, তা গত ১০ বছরে দেখিনি।
কালের কণ্ঠ অনেক বেশি ভাইব্রেন্ট ও আলোচিত
এম এ আজিজ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআমি পাবনার সাঁথিয়া এলাকার মানুষ। ছোটবেলায় গ্রামে বৈশাখে যে আমেজ দেখতাম—পালাগান, যাত্রাগান, হাডুডু বা দাড়িয়াবান্ধা খেলা। এবারের বৈশাখে নিজ এলাকায় যোগাযোগ করে জানলাম তেমন কিছু আর হচ্ছে না। মেলার আয়োজনও কমে গেছে। তবে ঢাকা শহরে মানুষের ঢল নেমেছে; সবার মধ্যে অনেক আনন্দ-উৎসাহ। ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে যেটাই রাখা হোক না কেন, ইতিবাচক দিক হলো—উগ্রপন্থীরা যেটিকে আগে ‘হিন্দুয়ানি’ বলে প্রচার করত, এখন অনেক রাজনৈতিক দলই সেই শোভাযাত্রায় অংশ নিচ্ছে। যদিও অনেকে অনুভূতির চেয়ে সামাজিক আচার হিসেবেই এতে শামিল হচ্ছে।
আগের তুলনায় বর্তমানে ‘কালের কণ্ঠ’ অনেক বেশি ভাইব্রেন্ট ও আলোচিত।
বিগত সরকার আমাদের সাংস্কৃতিক সত্তাকেই ধ্বংস করতে চেয়েছিল
মাহবুব কামাল, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠমানুষের মধ্যে জৈবিক পার্থক্য খুব বেশি নেই, মূল পার্থক্যটা হলো সাংস্কৃতিক। এই সংস্কৃতিই একটি জাতিকে অন্য জাতি থেকে আলাদা ও স্বতন্ত্র পরিচয় দেয়। ইউনূস সরকার আমাদের সেই সাংস্কৃতিক সত্তাকেই ধ্বংস করতে চেয়েছিল, যাতে আমরা স্বনির্ভর জাতি হিসেবে দাঁড়াতে না পারি।
এই ১৮ মাসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মব বা গণপিটুনিকে প্যাট্রোনাইজ করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা যখন বলেন, ‘ওরা তো তোমাদের গ্রামেই আছে’ কিংবা তাঁর প্রেস সেক্রেটারি যখন মবকে ‘প্রেসার গ্রুপ’ বলে অভিহিত করেন, তখন বোঝা যায় এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ, যার লক্ষ্য ছিল একটি নেশন বা জাতিকে দুর্বল করে দিয়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রেস সেক্রেটারি তো ‘মব’ আর ‘প্রেসার গ্রুপ’-এর পার্থক্যই জানেন না। তাঁরা ভেবেছিলেন এ দেশের মানুষ সব বোকা, যা বলবেন তা-ই শুনবে। পহেলা বৈশাখের এই উৎসবে এসে আজ আমার মনটা ভরে গেছে।
অন্তর্বর্তী সময়ের ১৮ মাস ছিল শ্বাসরুদ্ধকর অধ্যায়
মঞ্জুরুল আলম পান্না, সাংবাদিক
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআদর্শগত দিক থেকে কালের কণ্ঠ নিয়ে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন থাকতে পারে—বিতর্কের ঊর্ধ্বে আসলে কেউ নয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে পরবর্তী ১৮-২০ মাস কালের কণ্ঠ যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাদের অনড় অবস্থান আমাকে বিস্মিত করেছে। যারা বিগত ১৫ বছর মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিল, ৫ আগস্টের পর সেসব গণমাধ্যম রাতারাতি ভোল বদলে ফেলেছে। হাতে গোনা দু-একটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া আর কেউ নিজস্ব স্বকীয়তা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধরে রাখতে পারেনি। তবে কালের কণ্ঠের বড় কৃতিত্ব হলো—তারা যেমন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলা মানুষদের জায়গা দিয়েছে, তেমনি জামায়াত বা এনসিপির মতো বিপরীত মতাদর্শের মানুষদেরও স্পেস দিয়েছে। এটাই প্রকৃত গণতন্ত্র। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে এই স্পেস তৈরি করে দেওয়ার জন্য আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। বিস্ময়কর হলো, যাঁরা একসময় মুক্তিযুদ্ধের কট্টর সমর্থক সেজে দালালি করতেন, তাঁরা ভয়ে বা সুবিধাবাদিতার কারণে রাতারাতি বদলে গেলেন।
ইউনূসের মতো বিশ্বাসভঙ্গকারী শাসক আমি জীবনে দেখিনি
মোস্তফা ফিরোজ, সিনিয়র সাংবাদিক
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠড. ইউনূসের মতো ব্যক্তির প্রতি আমাদের অনেক ভরসা ছিল; আমরা চেয়েছিলাম আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে তৃতীয় কোনো শক্তি আসুক। কিন্তু এই লোকটির মতো ‘স্টুপিড’ ও বিশ্বাস ভঙ্গকারী শাসক আমি জীবনে দেখিনি। তিনি শুধু চাতুরীর মাধ্যমে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করেছেন এবং একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সম্ভাবনাকে গলা টিপে হত্যা করেছেন।
আগে আমার ধারণা ছিল, বিএনপি হয়তো জামায়াতেরই একটি বর্ধিত অংশ। কিন্তু গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমার সেই ভুল ভেঙেছে। বিশেষ করে ৭২-এর সংবিধানকে আঁকড়ে ধরা, দ্রুত নির্বাচনের দাবি এবং জামায়াতের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধিতা করে তাদের শক্ত অবস্থান দেখে আমি মুগ্ধ। পহেলা বৈশাখের মতো একটি সর্বজনীন উৎসবকে—যাকে উগ্রপন্থীরা হিন্দুদের অনুষ্ঠান বলে প্রচার করে, ওন করে, বিএনপি যে সাহসিকতা দেখিয়েছে, তা নির্বাচনের মতো করেই প্রশংসার দাবি রাখে। বিএনপি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসাতেই আজ আমরা দেশে থাকার সাহস পাচ্ছি।
‘কালের কণ্ঠ’ একটি আদর্শ পত্রিকার মতো বাংলাদেশের পক্ষে
আব্দুন নূর তুষার, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের গতি-প্রকৃতি আমি প্রথম দিনেই বুঝেছিলাম। যেদিন নূরজাহান বেগমকে উপদেষ্টা করা হলো, আমি তখনই ভিডিওর মাধ্যমে সেই নিয়োগ প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। ইউনূস সাহেবের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল, তাঁর অপদার্থ নিয়োগগুলো, বিশেষ করে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এবং তাঁর ক্রমাগত স্বজনপ্রীতি।
আমি দেখেছি ‘কালের কণ্ঠ’ একটি আদর্শ পত্রিকার মতো বাংলাদেশের পক্ষ নিয়েছিল। এটি শুধু মালিকের স্বার্থ দেখেনি। করপোরেট দায়বদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা যে সাহসিকতার সঙ্গে সংবাদ প্রচার করেছে, তা প্রশংসনীয়। আনিস আলমগীরকে যেভাবে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হলো, তা জঘন্য। ইউনূস সরকার শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করেছে। প্রধান উপদেষ্টা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মিথ্যা কথা বলেন।
ড. ইউনূস প্রমাণ করেছেন যে একজন অসভ্য লোকও নোবেল পুরস্কার পেতে পারে। অং সান সু চি বা বারাক ওবামার মতো তিনিও এই পুরস্কারের সুনাম নষ্ট করেছেন।
গালিগালাজ করে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হয়ে ওঠার অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে
ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাবি
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআওয়ামী লীগের শাসনামলে যেমন সত্য বলার কারণে অনেকে ‘ব্যাশিং’-এর শিকার হয়েছেন, গত ১৮ মাসেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে আশার কথা হলো, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু মানুষ এখনো ন্যায়ের পথে দাঁড়িয়ে আছেন। ১৫ বছর ধরে আমাদের পাঠ্যপুস্তকে যেভাবে একপাক্ষিক ইতিহাস গেঁথে দেওয়া হয়েছে, সেটি আমাদের সন্তানদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। আমার সন্তানও একসময় বলেছিল যে সমাজবিজ্ঞানে শুধু নির্দিষ্ট একটি দল বা ব্যক্তির কথা লিখলেই নম্বর পাওয়া যেত। কিন্তু গত ১৮ মাসে আমরা যা দেখলাম, তা আরো ভয়াবহ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বর্তমানে যে বিতর্ক বা ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চলছে, তা আমাকে ব্যথিত করে। ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন একজন সাংবাদিক আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসেন, আমি নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। আমি শঙ্কিত যে আমাদের এই প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধারা যখন থাকবেন না, তখন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বলার সাহস কার থাকবে? বর্তমানে গালিগালাজ বা কাউকে আক্রমণ করে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হয়ে ওঠার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা নতুন প্রজন্মের মাঝে শুরু হয়েছে, তা একটি ভয়াবহ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
১৮ মাস শাসন করেছেন একজন ‘হাফ নোবেল লরিয়েট’
আবু আলম মো. শহিদ খান, সাবেক সচিব
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআজ একটি কথা না বললেই নয়, যাঁদের দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চিনতাম, গত কয়েক মাসে তাঁদের একদম অন্য চেহারায় দেখছি। ৫ আগস্ট বা তথাকথিত ‘৩৬শে জুলাই’—এই সময়ে মানুষের যে রূপান্তর দেখলাম, তা বিস্ময়কর। এই কথিত বিপ্লবের সংজ্ঞা নিয়ে তো প্রথম থেকেই কথা হচ্ছে। আমার মনে হয়, ৪০ বছর ধরে যাঁদের চিনতাম, গত ১৮ মাস তাঁদের আর চিনতে পারিনি। এখন পরিস্থিতি বদলেছে, হয়তো তাঁরা আবার তাঁদের পুরনো রঙে ফিরবেন। ছোটবেলায় গিরগিটির রং বদলানো দেখতাম, এখন মানুষের সেই রূপান্তর দেখছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী নই, কখনোই ছিলাম না। তবে যদি কিছু নিষিদ্ধ করতেই হয়, তাহলে বাংলাদেশে যারা ‘গুপ্ত রাজনীতি’ করে, তাদের করতে হবে। এই গুপ্ত বা ছদ্মবেশী শক্তিগুলোই বাংলাদেশের আসল শত্রু। যারা লুঙ্গির তলে লুকিয়ে থাকে কিংবা হেলমেট পরে নিজের চেহারা আড়াল করে মব তৈরি করে, তারাই ১৮ মাস ধরে আমাদের শাসন করেছে। এদের চিহ্নিত করা এবং রুখে দেওয়া জরুরি।
ড. ইউনূসকে প্রথম দিন থেকেই ‘বাটপার’ বলে আসছি
মোহসিন রশীদ, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে আমার মামলার শুনানিতে আমাকে ‘হ্যাবিচুয়াল কনটেমনার’ (অভ্যাগত আদালত অবমাননাকারী) বলে অভিহিত করেছিলেন। আমি সুপ্রিম কোর্টে লিখিত হলফনামার মাধ্যমে তার যথাযথ জবাব দিয়েছি, যা আদালতের নথিতে রেকর্ড হিসেবে রয়েছে। ড. ইউনূস এখন বিদায় নিয়েছেন। আমি প্রথম দিন থেকেই তাঁকে ‘বাটপাড়’ বলে আসছি এবং আপনাদের টক শোতেও তা বলেছি। তাঁর সরকারটি ছিল মূলত বখাটেদের সরকার। জনগণের সঙ্গে সেই সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং তারা দেশকে ধ্বংস করা ছাড়া আর কিছুই করেনি।
বর্তমান সরকারের প্রায় দুই মাস পূর্ণ হতে চলেছে। এখন পর্যন্ত যা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে এটি তারা শুধু একটি পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে চলতে চাইছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, সেই পরিকল্পনাটি আসলে কী? মানুষের যদি ভিশন বা দূরদর্শিতা থাকে, তবেই সে পরিকল্পনা করতে পারে। অথবা যদি কোনো স্বপ্ন থাকে, তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পনা সাজানো হয়।
দেশে বিরাজনৈতিকীকরণের অপচেষ্টা শুরু ১-১১ থেকেই
মাহবুব আজিজ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআমাদের দেশে বিরাজনৈতিকীকরণের চেষ্টা সব সময়ই ছিল, কিন্তু গত ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকার এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে করার চেষ্টা করেছে। এর একটি লিখিত রূপ হলো ‘জুলাই সনদ’। এই সনদের মূল লক্ষ্য হলো আগামী দিনের রাজনীতিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা, যাতে বিএনপি বা আওয়ামী লীগের মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে। এর শেকড় মূলত ১/১১-এর সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টার গভীরে প্রোথিত। সংসদীয় পদ্ধতিতে দুই মেয়াদের (টার্ম) বেশি প্রধানমন্ত্রী হওয়া যাবে না—এমন অদ্ভুত বিধান চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ সংসদীয় ব্যবস্থায় সব সিদ্ধান্ত হয় ভোটাভুটির মাধ্যমে। প্রেসিডেন্টশাসিত ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কমানোর জন্য মেয়াদের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হতে পারে, কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থায় এটি শুধু বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তৈরির পথ রুদ্ধ করার জন্যই আনা হয়েছে। কিছু অনির্বাচিত মানুষ, যাঁরা জনগণের পালস বোঝেন না, বিদেশ থেকে পড়ালেখা করে এসে ঠিক করে দিতে চাইছেন এ দেশের রাজনৈতিক দল বা সরকার কিভাবে চলবে। অথচ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়ালে তাঁরা জামানত হারাবেন।
সংকট কাটাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবাটা এখন জরুরি
মাসুদ কামাল, সিনিয়র সাংবাদিক
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআমাদের আলোচনায় অতীত ও বর্তমান উঠে আসছে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবাটা এখন জরুরি। আলোচনার সারমর্ম থেকে বুঝলাম, ড. ইউনূস সাহেব অনেক ভুল বা খারাপ কাজ করে গেছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, সেই খারাপ কাজগুলো যদি বর্তমান সরকারও বয়ে নিয়ে বেড়ায় বা সংরক্ষণ করে, তাহলে আমরা এই সময়কে ‘ভালো’ বলব কিভাবে?
এখানে আনিস আলমগীর বা পান্না সাহেবের কথা বলা হলো। তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তো নিজেদের ৮০-৯০ হাজার মামলা তুলে নিয়েছে। তাহলে এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যেসব অন্যায় মামলা হয়েছে, সেগুলো কেন তোলা হচ্ছে না? নতুন মামলা হচ্ছে না বলে আমরা আনন্দিত হতে পারি, কিন্তু যাঁদের নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে, তাঁদের কষ্ট তো কমেনি। আমাদের নিজেদের মামলা হলে খারাপ, আর তোমাদের বেলা সমস্যা নেই—এই মানসিকতা নিয়ে ভালো শাসক হওয়া সম্ভব নয়। দুনিয়াটা এত সহজ নয় যে, ইউনূস নেই এই খুশিতেই মানুষ সারা জীবন হাততালি দেবে।
সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো একেক সময় একেক রাজনৈতিক তকমা
আনিস আলমগীর, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠকারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আমি এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মানুষ আমাকে দেখলেই জড়িয়ে ধরছেন, বলছেন যে তাঁরা আমার জন্য দোয়া করেছিলেন।
আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এই সাধারণ মানুষের দোয়া আর মহান আল্লাহর রহমতের কারণেই আমি বের হতে পেরেছি। আইনি মারপ্যাঁচে আমাকে যেভাবে আটকানো হয়েছিল, তাতে সরকারি উচ্চ পর্যায়ের সদয় দৃষ্টি না
থাকলে হয়তো বের হওয়া কঠিন হতো।
আমার জীবনে সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, আমাকে একেক সময় একেক রাজনৈতিক তকমা দেওয়া হয়। জুলাই আন্দোলনে যখন আবু সাঈদ মারা গেল, আমি এর প্রতিবাদে লিখেছিলাম। তখন দীপু ভাই (অনলাইনে) আমাকে ‘আওয়ামী লীগের সাংবাদিক’ বলে অ্যাখ্যা দিলেন যে, সরকারের লোক হয়েও আমি কেন প্রতিবাদ করছি। আবার যখন আমি তৎকালীন বিরোধী দলের ব্যর্থতা বা জাতীয় সম্পদ নষ্ট করা নিয়ে লিখলাম, তখন বর্তমানপন্থী অ্যাক্টিভিস্টরা প্রচার করতে শুরু করল যে, আমি শেখ হাসিনাকে হাইলাইট করছি।
গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা ও ‘ট্যাগিং’ রাজনীতি
অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠকোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট কোনো পরিচয়ে চিহ্নিত করে বিতর্কিত করার প্রচারটা চালায় কিন্তু আমাদের মাধ্যমগুলো—সেটি ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া যা-ই হোক না কেন। সুতরাং কারো ব্যক্তিগত অবস্থান নিয়ে বা আনিস আলমগীরের মতো ব্যক্তিদের নিয়ে যখন অহেতুক বিতর্ক ছড়ানো হয়, তখন মিডিয়ারও দায়ভার এড়ানো উচিত নয়। প্রচারের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের আরো দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
পহেলা বৈশাখ ও কালের কণ্ঠের এই আয়োজন নিয়ে বলতে চাই, বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি একটি অনন্য সেতুবন্ধ। পৃথিবীতে অনেক ধর্মীয় আচার বা সংস্কৃতি আছে, যা শুধু নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু বৈশাখ এমন একটি জায়গা, যা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে দেশের সব মানুষকে একটি ‘আমব্রেলা’ বা অভিন্ন ছাতার নিচে নিয়ে আসতে পারে। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান বিভাজন নেই। আপনি একে ‘সর্বজনীন’ বা ‘সার্বজনীন’ যে নামেই ডাকুন না কেন, এটি সব সম্প্রদায়ের জন্য একটি অভিন্ন মিলনমেলা। আমার ঈদের নামাজ আমার আনন্দ, আপনার মন্দিরে যাওয়া আপনার আনন্দ; কিন্তু বৈশাখ হলো আমাদের সবার কমন একটা জায়গা।
এই সম্মিলন আমাদের সঠিক দিকনির্দেশনার শক্তি ও প্রেরণা দেবে
হাসান হাফিজ, সম্পাদক, কালের কণ্ঠ
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠউপস্থিত সকল গুণীজন, প্রাজ্ঞ বিদ্বজ্জন এবং বিবেকের কণ্ঠস্বরদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। আজকের এই আড্ডা থেকে যে সারসংক্ষেপ উঠে এসেছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সামনে হয়তো আরো কঠিন দুঃসময় অপেক্ষা করছে। তবে আপনাদের এই সম্মিলন আমাদের পাথেয় জোগাবে এবং জাতি ও সংবাদপত্রকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার শক্তি ও প্রেরণা দেবে।
আমি যখন কালের কণ্ঠের সম্পাদকের দায়িত্ব নিই, তার মাত্র তিন দিনের মাথায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে সম্পাদকদের একমাত্র বৈঠকে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাই। সেখানে আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে তাঁকে বলেছিলাম, গোপালগঞ্জের জায়গায় চিটাগং করবেন না। অর্থাৎ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ বা বৈষম্য যেন নতুন রূপ না নেয়। আমি তাঁকে আরো বলেছিলাম, রাজনৈতিক দলগুলো আপনাকে খুব বেশি ‘যৌক্তিক সময়’ দেবে না। অন্তত পরীক্ষামূলকভাবে ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলো দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম, যা তিনি তখন দেননি।
আলোচনায় উপস্থিত প্রত্যেকে একেকজন যোদ্ধা
হায়দার আলী, নির্বাহী সম্পাদক, কালের কণ্ঠ
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআজকের এই আড্ডায় উপস্থিত প্রত্যেকেই আমার দৃষ্টিতে একেকজন যোদ্ধা। দেশ ও সমাজকে যে ভয়াবহ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি এবং অপশক্তির ছায়া গ্রাস করতে যাচ্ছিল, সেখান থেকে আপনারা আপনাদের কলম, কণ্ঠ আর সাহসিকতা দিয়ে মুক্ত করেছেন। আপনাদের এই আলোকিত মুখগুলোই আমাদের আগামী দিনের প্রেরণা। প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে আমরা আজ যে মুক্ত বাতাসে কথা বলছি, এটি আপনাদের মতো সাহসী মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টারই ফসল।
পহেলা বৈশাখ মানেই নতুনের আহ্বান এবং জীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক চিরন্তন প্রেরণা। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এই প্রাণের উৎসব শুধু একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ বা নিছক উৎসব নয়; এটি আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক। এটি ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সকল বাঙালির মিলনমেলা এবং একটি অনন্য সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ।
কালের কণ্ঠের এই বৈশাখী আড্ডা শুধু স্মৃতিচারণায়ই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি রূপ নিয়েছে এক অনানুষ্ঠানিক জাতীয় সংলাপে।
জীর্ণতাকে ঝেরে ফেলে আমরা যেন প্রগতিশীল আগামী নির্মাণ করতে পারি
ফারুক মেহেদী, বার্তাপ্রধান, কালের কণ্ঠ
সাহসী সাংবাদিকতার স্পষ্ট কণ্ঠস্বর কালের কণ্ঠআজ শুধু উৎসবের আড্ডা নয়, বরং আপনাদের প্রতিটি কথা আমাদের পেশাগত জীবনের জন্য একেকটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছে। আমাদের এই ক্ষুদ্র আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আপনারা যে প্রাণবন্ত আলোচনার জন্ম দিয়েছেন, তার জন্য কালের কণ্ঠ পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই।
আমরা আজকের এই আড্ডার আয়োজন করেছিলাম এমন এক সময়ে, যখন দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন। আজকের এই আলোচনায় উঠে এসেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত ইতিহাস, ১৮ মাসের এক দুঃসহ শাসনব্যবস্থার বিশ্লেষণ এবং আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আসা কালো থাবার কথা। পরিশেষে বলব, এই বৈশাখী আড্ডা শুধু উৎসবের সমাপ্তি নয়, বরং একটি নতুন সংগ্রামের শুরু, যে সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে আমরা যেন এক সুন্দর ও প্রগতিশীল আগামী নির্মাণ করতে পারি, এটাই আমাদের মূল প্রত্যাশা। আপনাদের এই সংহতি আমাদের ভ