দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর নাব্যতা রক্ষা ও নৌ-যোগাযোগ সচল রাখার দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগ এখন একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালিত হলেও আরিচা–কাজীরহাট, দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া, ভৈরব–আশুগঞ্জ এবং মোংলা–ঘষিয়াখালীসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌরুটে কাঙ্ক্ষিত গভীরতা ও স্থায়ী উন্নতি না হওয়ায় কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে জ্বালানি ব্যবহারের স্বচ্ছতা, ড্রেজার পরিচালনার প্রকৃত সময় এবং বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার হিসাব নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে প্রমাণিত হয়নি, তবুও বিষয়টি প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ড্রেজিং বিভাগকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর নাব্যতা রক্ষা এবং নৌ-যোগাযোগ সচল রাখার দায়িত্বে থাকা এই বিভাগটি এখন কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে।
বিশেষ করে আরিচা–কাজীরহাট, বরিশাল লঞ্চগাট নদী দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া, ভৈরব–আশুগঞ্জ এবং মোংলা–ঘষিয়াখালী নৌপথে ড্রেজিং কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো প্রশাসনিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, প্রতিবছর ড্রেজিং খাতে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। তবে একাধিক নৌ-পরিবহন সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি, এই ব্যয়ের অনুপাতে নৌপথে দৃশ্যমান গভীরতা বা স্থায়ী উন্নতি দেখা যায় না।
লঞ্চ ও জাহাজ মালিকদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বারবার ড্রেজিং করা হলেও নাব্যতা সংকট রয়ে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, “ড্রেজার কাজ করছে বলা হলেও বাস্তবে সুফল মিলছে না—নৌযান আটকে পড়ার ঘটনা কমছে না।”
ড্রেজিং কার্যক্রমে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো জ্বালানি ব্যবহারের স্বচ্ছতা। একাধিক সূত্রের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ড্রেজার চলাচলের লগবই ও প্রকৃত অপারেশন সময়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভুয়া লগবই বা অতিরিক্ত সময় দেখিয়ে জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব ড্রেজার বহর থাকা সত্ত্বেও কেন বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্রগুলো বলছে, কিছু প্রকল্পে বেসরকারি ড্রেজারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, যেখানে বাস্তব কাজ ও বিলের মধ্যে মিল আছে কি না—তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ড্রেজার অচল বা কম ব্যবহার হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ নীতিমালা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ড্রেজিংয়ের প্রযুক্তিগত দিকেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী খননকৃত পলি নির্দিষ্ট দূরত্বে নিষ্পত্তি করার কথা থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে তা নদীর মধ্যেই ফেলা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ফলে জোয়ার-ভাটার প্রভাবে পলি আবার আগের স্থানে ফিরে যাচ্ছে, যা একই জায়গায় বারবার ড্রেজিং ও ব্যয় বৃদ্ধির একটি চক্র তৈরি করছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
ড্রেজার রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত খাতেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিছু সূত্রের দাবি, যন্ত্রাংশ কেনা ও মেরামতের ব্যয় বাস্তব কাজের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য অডিট ও স্বতন্ত্র যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন।
বিভাগের কিছু প্রকৌশলী ও কর্মচারীর বক্তব্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত এবং অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তুললে বদলি বা প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। তবে এসব দাবিও এখনো যাচাইযোগ্য প্রমাণের অপেক্ষায়।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ড্রেজিং প্রকল্পের কিছু অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলমান।
অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকেও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর নথি পর্যালোচনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিং, জিপিএস-ভিত্তিক ট্র্যাকিং এবং স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
বাংলাদেশের নদীপথ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও ড্রেজিং ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, তা সমাধান না হলে এই খাতের ওপর আস্থা আরও দুর্বল হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সব অভিযোগের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রক্রিয়া।