একদিকে উত্তাল সমুদ্রের গর্জন, অন্যদিকে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক—এই দুইয়ের মাঝখানে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ। দীর্ঘ ৩৫ বছরেও একটি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় ক্রমাগত ভাঙনের মুখে পড়ে দ্বীপটি ছোট হয়ে আসছে।
স্থানীয়দের দাবি, এক সময় প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কুতুবদিয়া এখন সঙ্কুচিত হয়ে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটারে নেমে এসেছে। তাদের আশঙ্কা—দ্রুত ‘সুপার ডাইক’ নির্মাণ না হলে অদূর ভবিষ্যতে দ্বীপটি মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারের চাপে আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের তাবলেরচর, কাহারপাড়া এবং বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকার অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে শত শত একর ফসলি জমি ও লবণের মাঠ লোনাপানিতে তলিয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হাসেম বলেন,
“নোনাপানি ঢুকে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেছে। আগে নিজের জমিতে কাজ করতাম, এখন অন্যের জমিতে মজুরি করতে হচ্ছে।”
বসতবাড়ি হারিয়ে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছরই এই বাস্তুচ্যুতির সংখ্যা বাড়ছে।
কৈয়ারবিল এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন,
“১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যায়। তিন দশকেও তা আর সংস্কার হয়নি। বর্ষা এলেই দুশ্চিন্তা বাড়ে। আশ্রয়কেন্দ্রও পর্যাপ্ত নেই—আমরা কি সাগরে ভেসে যাব?”
দক্ষিণ ধুরং ইউনিয়ন বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আজাদ। তিনি বলেন,
“বেড়িবাঁধ না থাকায় প্রতি বছর জোয়ারের পানিতে ঘরবাড়ি, লবণের মাঠ ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। দ্রুত সিসি ব্লক বা ‘সুপার ডাইক’ নির্মাণ জরুরি।”
একই দাবি জানিয়েছেন কুতুবদিয়া সমিতির সহসভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক হুমায়ুন সিকদার। তার ভাষায়,
“১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর ভয়াবহ ক্ষতি হলেও এখনো টেকসই বাঁধ হয়নি। সুপার ডাইক নির্মাণের পাশাপাশি যাতায়াতের সুবিধার জন্য সেতু বা ফেরি চালুর প্রয়োজন।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, কুতুবদিয়া অংশে ৬৩ কিলোমিটার সুপার ডাইক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশাল বাজেটের কারণে প্রকল্পটি এখনো বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
কক্সবাজার পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন,
“কয়েকটি এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বর্ষা মৌসুমের আগেই ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”