শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৫ অপরাহ্ন

ধ্বংসস্তূপের মাঝেও গাজায় কোরআনের সুর

রোজার মাসের আরেকটি দিনের সূচনা হলো ভোরের আলো ফুটতেই। পশ্চিম খান ইউনিসের আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত আল-শাফি মসজিদে ফজরের নামাজ শেষ হওয়ার সময় আকাশে ভনভন করা ইসরায়েলি ড্রোনের শব্দই শুধু শোনা যাচ্ছিল না। এর সঙ্গে ভেসে আসছিল গম্ভীর এক প্রতিধ্বনি—উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করা কোরআনের আয়াত।

সাদা পোশাক পরা সারি সারি ফিলিস্তিনি পুরুষ ও কিশোরে ভরে যায় মসজিদের প্রাঙ্গণ।

তাদের একটাই লক্ষ্য, সূর্যাস্তের আগেই পুরো কোরআন তিলাওয়াত শেষ করা। কেউ চেয়ারে বসে, কেউ মেঝেতে শুয়ে, তবে সবাই মনোযোগী সেই পবিত্র দায়িত্ব পালনে। 

মোট ২৫৬ জন কোরআন হাফেজ সেখানে বসেছিলেন। তাদের পাশে বসে থাকা সঙ্গীরা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন, প্রতিটি শব্দ অনুসরণ করে দেখছিলেন যাতে তিলাওয়াত নিখুঁত থাকে।

 

এই সমাবেশের নাম ‘সাফওয়াত আল-হুফ্ফাজ’, অর্থাৎ ‘কোরআন হাফেজদের সেরা দল’। গাজায় রমজান পালনের এটি একটি বিশেষ সম্মিলিত আয়োজন। তবে প্রায় দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের পর এই আয়োজনের তাৎপর্য আরও গভীর হয়েছে।

ইসলামে কোরআন মুখস্থ করা অত্যন্ত সম্মানের বিষয়, যার জন্য বছরের পর বছর শৃঙ্খলা, পুনরাবৃত্তি ও গভীর নিষ্ঠার প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন ধরে গাজায় কোরআন হিফজের সমৃদ্ধ একটি ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, যা মানুষের আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করে। 

একসঙ্গে বসে মুখস্থ থেকে পুরো কোরআন তিলাওয়াতের এই আয়োজন সেই ঐতিহ্যের অন্যতম অনন্য প্রকাশ।

ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধে ৭৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হলেও, অংশগ্রহণকারীরা এ বছরও এই আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে।

তিলাওয়াতে মনোযোগী ছিলেন ৫১ বছর বয়সী কোরআন হাফেজ মোহাম্মদ আল-কিরানাউই। গাঢ় রঙের চশমার আড়ালে লুকানো ছিল একটি সত্য—শৈশব থেকেই তিনি দৃষ্টিশক্তিহীন।

ছোটবেলায় চোখের দৃষ্টি হারালেও তা তাকে কোরআন মুখস্থ করতে বাধা দিতে পারেনি। 

তিনি বলেন, ‘কোরআন সবসময়ই আমার সেরা সঙ্গী। ১০ বছর বয়সে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে আমি পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারাই। কিন্তু সেই ক্ষতির মধ্যেও আল্লাহ আমাকে আরেকটি উপহার দিয়েছেন। আমি কোরআন মুখস্থ করা চালিয়ে যাই এবং শ্রবণশক্তির ওপর নির্ভর করে তা পরিপূর্ণ করি।’

বছরের পর বছর তিনি নিজের সন্তানসহ অন্যদেরও কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন, যাদের অনেকেই পরে হাফেজ হয়েছেন।

তবে ইসরায়েলের গণহত্যা তার পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংসযজ্ঞ এবং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম তার নিয়মিত কোরআন হিফজের আসরগুলোকে ভেঙে দিয়েছে। তবু সুযোগ পেলেই তিনি তিলাওয়াত চালিয়ে গেছেন।

Quran
দৃষ্টিহীন হওয়া সত্ত্বেও মোহাম্মদ আল-কিরানাউই (বাঁয়ে) পুরো কোরআন মুখস্থ করতে সক্ষম হয়েছেন

হাফেজ মোহাম্মদ আল-কিরানাউই বলেন, ‘এত কষ্টের মধ্যেও আমি আমার সঙ্গীকে ধরে রেখেছি। যখনই সম্ভব হয়েছে, তিলাওয়াত করেছি এবং আসরে যোগ দিয়েছি—হৃদয়ে কোরআনকে জীবিত রাখতে এবং তরুণ শিক্ষার্থীদের তাজবিদ শেখাতে।’

ধর্মীয় জীবনে যুদ্ধের প্রভাব
গাজার প্রধানত মুসলিম সমাজে মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্র। ধর্মীয় বিশ্বাস এখানে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

প্রায় প্রতিটি মহল্লায় মসজিদ একটি কমিউনিটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে, যেখানে মানুষ শুধু ধর্মীয় দিকনির্দেশনাই নয়, জীবনের চাপ থেকেও স্বস্তি খোঁজে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ধর্মীয় স্থানগুলো ফিলিস্তিনিদের গড়ে তুলেছে। একই কোরআন শিক্ষার আসরে বসেছেন আলেম, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও শ্রমিক—যেখানে শেখানো হয় শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও ঈমান।

কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এই আধ্যাত্মিক অবকাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকাটির ৮৯ শতাংশের বেশি মসজিদ, যা সংখ্যায় এক হাজারেরও বেশি, ধ্বংস বা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মসজিদে নামাজরত অবস্থায়ও অনেক মুসল্লি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে গাজার তিনটি ঐতিহাসিক গির্জাও বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই ব্যাপক ধ্বংসের ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ভেঙে পড়েছে এবং মুসল্লি ও শিক্ষার্থীরা বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয়শিবিরে ছড়িয়ে পড়েছেন।

তবুও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক ফিলিস্তিনি অস্থায়ী ধর্মীয় স্থান তৈরি করেছেন। শিবির ও আশ্রয়কেন্দ্রে কাঠ, ত্রিপল বা কাপড় দিয়ে বানানো ছোট মসজিদে মানুষ একত্রিত হয়ে নামাজ পড়ছেন, পড়াশোনা করছেন এবং কোরআন তিলাওয়াত করছেন।

কোরআনের কপি কম থাকায় অনেক সময় তা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই নাজুক পরিবেশের মধ্যেও গাজার কোরআন শিক্ষার ঐতিহ্য টিকে আছে এবং নতুন প্রজন্মের হাফেজ তৈরি হচ্ছে।

১৩ বছর বয়সী আবদুর রহমান আবু নিমর প্রায় আট ঘণ্টার তিলাওয়াত শেষে কোরআনের শেষ সূরায় পৌঁছেছে। সে জানায়, বাস্তুচ্যুত অবস্থাতেই সে কোরআন মুখস্থ সম্পন্ন করেছে। সে বলে, ‘আমি আমার বাড়ি, চাচা এবং অনেক বন্ধুকে হারিয়েছি। বাস্তুচ্যুত জীবনে আমরা ক্লান্ত এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই।’

‘অন্য বাস্তুচ্যুত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোরআন চর্চার আসর আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছে। আজ আবার তিলাওয়াত করতে পেরে আমি খুব খুশি। আমি নিয়মিত তা পুনরাবৃত্তি করব, যাতে কখনো ভুলে না যাই।’

আগুনের মধ্যে বিশ্বাস
এই আয়োজনে অংশ নেওয়া আরেক হাফেজ ওয়াসিম আবু সাহলুল শান্তভাবে আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন। কিন্তু তার জীবনের পেছনে রয়েছে গভীর ট্র্যাজেডি। গণহত্যার সময় তাকে আটক করে ইসরায়েলি কারাগারে নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন্দি বিনিময়ের অংশ হিসেবে মুক্তি পান।

কারাগারে ধর্মীয় অনুশীলন কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আমাদের কোরআনের কপি থেকে বঞ্চিত করেছিল। আমরা স্বাধীনভাবে নামাজ পড়তে বা আজান শুনতেও পারতাম না।’

তবু তিনি অন্য বন্দিদের কোরআন শেখানো বন্ধ করেননি। ওয়াসিম আবু সাহলুল বলেন, ‘আমরা একে অন্যকে কোরআন মুখস্থ করাতে শুরু করি। কেউ কেউ কয়েকটি সূরা, আবার কেউ পুরো কোরআন মুখস্থ করে ফেলেছিল। তাদের কয়েকজন আজ এখানে উপস্থিত।’

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি পরিবারের কাছে ফিরেছিলেন, কিন্তু সেই পুনর্মিলন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মুক্তির কয়েক মাস পর এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার পরিবারের নয়জন সদস্য নিহত হন।

তিনি বলেন, ‘১৮ জুলাই আমি আমার মা, আমার নয় বছরের ছেলে ইসলাম, আমার ভাই এবং তার সন্তানদের হারিয়েছি। আজকের এই তিলাওয়াত আমি আমার মা, সন্তান এবং পুরো পরিবারের আত্মার উদ্দেশে উৎসর্গ করছি।’

সব হারানোর পরও কোরআন তার শক্তির উৎস হয়ে আছে। তিনি বলেন,
‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি কোরআন তিলাওয়াত করে যাব। আমার কারারক্ষী ও হত্যাকারীদের প্রতি আমার বার্তা—আমরা কোরআনের মাধ্যমেই বেঁচে থাকি।’

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের চেষ্টা
গাজার কোরআন শিক্ষার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে কাজ করছে ‘দার আল-কোরআন অ্যান্ড সুন্না ইনস্টিটিউট’। এটি যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৩০টি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি।

মসজিদ ও স্কুল ধ্বংস হলেও আয়োজকরা জানিয়েছেন, যেখানে সম্ভব সেখানে কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আহমেদ আল-সাফিন বলেন, ‘যেমন বৃষ্টি যেখানে পড়ে সেখানেই উপকার বয়ে আনে, তেমনি কোরআনের জন্য কাজ করলেও যেখানেই করা হোক তা উপকার বয়ে আনে।’

তিনি জানান, যুদ্ধের কারণে অনেক মসজিদ ধ্বংস হওয়ায় আগের মতো কর্মসূচি চালানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু বাস্তুচ্যুত শিবিরেও মানুষ একত্র হয়ে কোরআন পুনরাবৃত্তি করছে। তারা এটিকে তাদের মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার পথ হিসেবে ধরে রেখেছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির শুরুতে তারা ৬৭টি কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র চালু করতে সক্ষম হন। পাঁচ মাসের মধ্যেই সেখানে ৩০০ শিশু, নারী ও পুরুষ যুক্ত হন এবং সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

তবে আল-শাফি মসজিদের এই আয়োজন আরও বড় একটি বার্তা বহন করে। আহমেদ আল-সাফিন বলেন, ‘কোরআন হাফেজদের সেরা দল’ এই আয়োজনটি বিশেষ, কারণ এটি গাজার সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ হাফেজদের একত্র করে। দুই বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধের পর এই আয়োজন একটি বার্তা দিচ্ছে—গাজাকে ভাঙা যাবে না। কোরআনের মাধ্যমে আমাদের আত্মা বেঁচে আছে, আমাদের মনও বিকশিত হচ্ছে।

সূর্যাস্তের আগেই হাফেজরা পুরো কোরআন তিলাওয়াত সম্পন্ন করবেন। এরপর তারা ফিরে যাবেন সেই জীবনে, যেখানে এখনও রয়েছে শোক, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তা—তবু হৃদয়কে দৃঢ় রাখতে আবারও কোরআনের আয়াতকে আঁকড়ে ধরবেন।



Our Like Page