শনিবার (২১ মার্চ) দুপুর ১২টা থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা যায়, নামাজ শেষে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘাটে আসতে শুরু করেছেন যাত্রীরা। কেউ যাচ্ছেন চাঁদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি ও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য জেলায়। লঞ্চগুলো নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যাচ্ছে বলে যাত্রীদের মধ্যে স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে।
এদিন সদরঘাটে অতিরিক্ত ভিড় বা চাপ দেখা যায়নি, যাত্রীরা ধীরে সুস্থে লঞ্চে উঠছেন, কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়া।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই শেষ মুহূর্তের কাজ শেষ করে বা টিকিট না পাওয়ায় ঈদের দিনই যাত্রা করছেন। কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবেই ঈদের দিনের তুলনামূলক কম ভিড়কে বিবেচনায় নিয়ে এই দিনটি বেছে নিয়েছেন।
পরিবার নিয়ে চাঁদপুর যাচ্ছেন মো. শাওন।
চাঁদপুর রুটে চলাচল করা লঞ্চ মূয়র-৭ এর ম্যানেজার বাংলানিউজকে জানান, ঈদের দিন এতো যাত্রী হবে ভাবিনি। ২টায় ছেড়ে যাবো, লঞ্চ ভরে গেছে। এমন যাত্রী থাকলে লঞ্চ ছাড়ানো আনন্দদায়ক হয়। সব সময় লোকসান তো আর ভালো লাগে না। দুই ঈদের সময় মালিকরা একটু লাভের মুখ দেখতে পারেন।
ভোলা যাচ্ছেন মো. আব্দুল আজিজ। তিনি বলেন, ঢাকায় ব্যবসা করি। চাঁদরাত পর্যন্ত বেচাকেনা চলেছে। এজন্য সব সময় ঈদের দিন নামাজ শেষে বের হয়ে গ্রামের উদ্দেশ্যে যাই। এদিন গেলে ভিড়ও কম থাকে, ছুটি নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এক সপ্তাহ বন্ধ থাকবে, আশা করি নিরাপদে পৌঁছাব।
ভোলা, ইলিশা ও কালিগঞ্জ রুটে চলাচল করা এম ভি সুরভি-৮ এর মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ভোলা রুটে বাইরোড নেই, তাই লঞ্চে চাপ সবসময় থাকে। আজও কিছুটা চাপ আছে, তবে গত দুই দিনের তুলনায় কম। দুপুর ২টায় ছেড়ে যাবে। সব কেবিন ভাড়া হয়েছে।
বরিশালগামী লঞ্চ এম ভি পূবালী-১ এর যাত্রী আয়নাল হোসেন বলেন, আগের দিন প্রচণ্ড ভিড় ছিল, তাই আজ ঈদের দিন নামাজ পরেই পরিবার নিয়ে বের হয়েছি। আশা করছি যাত্রা আরামদায়ক হবে।
বরিশাল ও বরগুনা রুটে চলাচল করা একই লঞ্চের মো: রবিউল ইসলাম জানান, ঈদের লঞ্চ খালি যাচ্ছে না, এটাই সবচেয়ে ভালো। লঞ্চ বিকেল ৬টায় ছাড়বে। এখন কিছু যাত্রী আসছে, বিকাল ৪টা থেকে ভিড় বাড়বে। ঈদের দিন এর চেয়ে বেশি যাত্রী হওয়ার কথা নেই। তবে আমরা সন্তুষ্ট, খালি লঞ্চ যাচ্ছে না।
এদিকে নৌপথে যাত্রীসেবা নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করা, নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা এবং যাত্রীদের হয়রানি বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতও কাজ করছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, ঈদের দিনও নিয়মিত লঞ্চ চলাচল অব্যাহত রয়েছে এবং যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।
লঞ্চ টার্মিনালে ট্রাফিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের অফিসের বার্থিং সারেং মো. মামুন বলেন, আজ দুপুর ২টা পর্যন্ত ঢাকা থেকে দেশের ৩৭টি রুটে ২০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। ঢাকায় এসেছে ৩০টি লঞ্চ। আজ রাত ১২টা পর্যন্ত আনুমানিক ৫৮-৬০টি লঞ্চ ঢাকা থেকে ছেড়ে যাবে। গতকাল ৭৬টি লঞ্চ দেশের ৩৭টি রুটে ছেড়ে গেছে।
যাত্রীদের নিরাপত্তা দিতে টার্মিনাল এলাকায় র্যাব, পুলিশ, নৌ-পুলিশ, ডিএমপি ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। নদীপথে নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ছোট নৌকা বা ডিঙ্গি থেকে যাত্রী ওঠা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এ বিষয়ে আগে থেকেই প্রচারণা চালানো হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ জানায়, নতুন সরকারের আমলে যাত্রীসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সদরঘাটকে আরও সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি নতুন সুবিধা চালু করা হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে মোট ১০ দিনের জন্য যাত্রীদের ফ্রি কুলি (পোর্টার) সেবা দেওয়া হচ্ছে। কুলিদের মজুরি বিআইডব্লিউটিএ নিজস্ব অর্থায়নে দেয়, ফলে যাত্রীরা কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন না।
মালামাল বহনের জন্য বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে ১শ’টি ট্রলি, যা যাত্রীরা ব্যবহার করতে পারবেন। অসুস্থ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ারের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০টি গেটে মোট ৪০টি রাখা হয়েছে। এ ছাড়া চাপ সামলাতে অতিরিক্ত দুটি ঘাট চালু করা হয়েছে। লঞ্চ মালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদ উপলক্ষে ভাড়া ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য স্বস্তি যোগ করেছে।