বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২২ অপরাহ্ন
শিরোনাম
৩ টাকার কলমে স্বপ্ন: ‘ইকনো কামাল’-এর গল্প,ব্যবসা থেকে রাজনীতির উত্থান শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি: ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্ক পেরিয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে ‘শান্তির খোঁজ’ প্লাস্টিক সার্জারি বিতর্কে মুখ খুললেন কেয়া পায়েল: “ভক্তরা মেনে নিতে পারেনি” দীর্ঘ অপেক্ষার পর দুই বাংলায় মুক্তি পাচ্ছে শবনম বুবলী অভিনীত ‘ফ্ল্যাশব্যাক’ অবরোধের মধ্যেও ইরানের ঘুরে দাঁড়ানো: ফ্লাইট চালু, তেল আয়ে উল্টো বৃদ্ধি হরমুজ সংকটের ছায়ায় নতুন বাণিজ্যপথ: ইউরোপমুখী বিকল্প করিডোরে জোর দিচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য সংকট: তেলের দাম বেড়ে ১১১ ডলার, চাপে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতি কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক মিডফোর্ট হাসপালের হিসাব রক্ষক জাহিদুর রহিম খিলগাঁওয়ের সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেলের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ গণপূর্তের প্রকৌশলী ফজলুল হক মধু :দুদকের তদন্ত ধামাচাপা দিয়ে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়

বাংলাদেশের বুক থেকে পাথর নেমে যাওয়ার পর প্রথম ঈদ উৎসব

এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর দরজায় কড়া নাড়ছে। নাড়ির টানে ঘরমুখো মানুষ ছুটছে আপন ঠিকানায়, গ্রামের বাড়ি। ঈদযাত্রার নানান দুর্ভোগ আর ভোগান্তি উপেক্ষা করে মানুষ ছুটছে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে। সব ঈদেই এক আবেগঘন উচ্ছ্বাস আমরা দেখি।

এবারের ঈদে সেই নিখাদ আনন্দের মাত্রাটা যেন একটু বেশিই। যারা ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে আপন ঠিকানায় ছুটে যাচ্ছে, কিংবা যারা ইট-কংক্রিটের এ শহরেই ঈদ উদ্‌যাপন করবে, তাদের সবার মধ্যেই একটা স্বস্তির প্রকাশ। সবাই যেন দমবন্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দিত। 

ট্রেনে ঈদযাত্রার ছবি পোস্ট করে এক সরকারি চাকরিজীবী লিখেছেন, ‘মবের ভয়ে দুই ঈদ বাবা-মার সঙ্গে করতে পারিনি।

মবের রাজা বিদায় নিয়েছে, তাই এবার বাড়ি যাচ্ছি।’ এ রকম বক্তব্য কেবল একজন সরকারি চাকুরের নয়, অগণিত মানুষের। 

গত বছরের দুটি ঈদ ভুলে যেতে চাইবেন বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধান, রাষ্ট্রপতি। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, কী দুঃসহ সময় কেটেছে তাঁর গত দুই ঈদে।

এমনকি জাতীয় ঈদগাহে তাঁকে ঈদের নামাজ আদায় করতে দেওয়া হয়নি। একটি শাসনব্যবস্থা কতটা নিষ্ঠুর ও অমানবিক হলে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তির সঙ্গে এ রকম আচরণ করা যায়, তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। রাষ্ট্রের অভিভাবকের যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের ঈদ কেমন হয়েছিল গত বছর, তা সহজেই অনুমান করা যায়। 

গত বছর ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ছিল চোখে পড়ার মতো। বেতন-ভাতার দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন।

মিরপুর, রামপুরা, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বেতন-ভাতার দাবিতে বিক্ষোভ করেন। ড. ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর একের পর এক কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বহু কারখানা মব সন্ত্রাসের শিকার হয়। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় অনেক কারখানায়। শিল্পমালিক, উদ্যোক্তারা প্রতিকার পাননি, পাননি ন্যায়বিচার। অনেক কারখানা দিনের পর দিন আগুনে পুড়েছে, নির্বিচার লুটপাট করা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এগিয়ে আসেনি। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে এসব সন্ত্রাস প্রতিরোধে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়া হয়নি কোনো নির্দেশনা। বরং ইউনূস সরকারের নীরব সমর্থন ছিল মবের প্রতি। মব সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা ছিল অন্তর্র্বর্তী সরকারের। সরকারের প্রশ্রয়ে মব বাহিনী হয়ে উঠেছিল অপ্রতিরোধ্য। এমনকি মব সৃষ্টিকারী, চাঁদাবাজদের থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়েছিল। চাঁদাবাজি করে হাতেনাতে ধরা পড়া আসামিকে জেল থেকে মুক্ত করা হয়েছে আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে। এক চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে দেশের মানুষ। গত ঈদ কেটেছে চরম অনিশ্চয়তায়, ভয়ংকর আতঙ্কে। এবারের ঈদে সেই আতঙ্ক থেকে আমরা মুক্ত। 

হামলা, লুটপাটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বেতন দিতে পারেনি মালিকপক্ষ। আবার অনেক উদ্যোক্তা মবের ভয়ে কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছিলেন। লাখ লাখ শ্রমিকের গত ঈদ কেটেছে অনাহারে, ভিক্ষাবৃত্তি করে। তাঁরা ঈদে হাসতে পারেননি, তাঁদের ঈদ ছিল কান্নাভেজা।

দেড় বছরের বিনিয়োগবিনাশী সরকারের বিদায়ের পর মালিকরা নতুন করে আবার সবকিছু শুরুর অপেক্ষায়। শ্রমিকরাও আশায় বুক বেঁধে আছেন। নতুন সকালের অপেক্ষায়। সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে এমন আশা করছেন মালিক-শ্রমিক সবাই। এবার ঈদ তাঁদের জন্য স্বস্তির। একজন শ্রমিক বলছিলেন, ‘কীভাবে দেড়টা বছর পার করেছি আল্লাহ জানেন। এমন খারাপ সময় যেন আর কখনো ফিরে না আসে কারও জীবনে।’

মাত্র এক মাসে কোনো বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের মনে ভয় আর আতঙ্ক কেটে গেছে। সবাই নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। নতুন করে শুরুর প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করেছে। এবারের ঈদ তাই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন সৃষ্টির সূচনা।

গত দেড় বছরে দুটি ঈদে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্যও ছিল অন্ধকার সময়। একজন দোকানি বলছিলেন, ‘চাঁদাবাজদের অত্যাচারে গত দুই ঈদে ব্যবসা করতে পারিনি। এবার সেই চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য নেই।’

গত দেড় বছর গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করে রাখা হয়েছিল। তার পরও ঈদে চাঁদাবাজি, শপিং মলে হামলার খবরগুলো এখনো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মনে জাগরূক। সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, টানাপোড়েনের মধ্যেও মানুষ তার শেষ সম্বলটুকু দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চাইছে। এটা কেবল ঈদ উৎসব নয়, এ যেন মুক্তির উদ্‌যাপন।

বিগত দেড় বছরে গণমাধ্যমের অবস্থা কী ছিল, তা বোঝা যায় বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক এ. কে. এম. মন্জুরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর লেখা থেকেই। সম্প্রতি জেল থেকে মুক্তি পাওয়া আলোচিত সাংবাদিক আনিস আলমগীরের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, ড. ইউনূস সরকারের আমলে গণমাধ্যমের নিপীড়ন ও কণ্ঠরোধের ভয়াবহ চিত্র। এবারের ঈদ তাই গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অন্যরকম আনন্দের।

‘আমাদের সেই ১৮ মাস’ শিরোনামে সাড়াজাগানো লেখায় মন্জুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১৮ মাস আমরা সরকারের কারণে ভয়াবহ চাপে ছিলাম। বৈষম্যবিরোধী নামধারী কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষের মবের শিকার হয়েছি।’ আনিস আলমগীর মুক্তির পর ডয়েচে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে বেশি। সংবাদপত্রে কে চাকরি করবে, না করবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা। যে-কেউ যেকোনো পত্রিকা অফিসে মব করতে পারে।’

দলমতনির্বিশেষে সব গণমাধ্যমকর্মীর জন্য তাই এবারের ঈদ উৎসবের, মুক্তির। যাঁরা এতদিন আতঙ্কের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁদের আতঙ্ক কিছুটা হলেও কম হয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকার আর যা-ই হোক, ইউনূস সরকারের মতো গণমাধ্যমের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াবে না, এমনটাই আশা করছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।

খেলাধুলায় ধ্বংসের তাণ্ডব চালিয়েছে ইউনূস সরকার। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মতো আসরে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? এবার ক্রীড়াবিদদের জন্য নিশ্চয়ই স্বস্তির ঈদ। এমন ক্রীড়াবিদ্বেষী সরকার যেন না আসে সেই কামনা করবেন সব খেলোয়াড় এবং সমর্থক এ ঈদে। এবারের ঈদ তাঁদের জন্য দুঃসহ স্মৃতি ভোলার উপলক্ষ।

গত দেড় বছরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছিল ভয়, দমবন্ধ অবস্থা। ইউনূস সরকারের আশকারা পেয়ে দানব হয়ে ওঠা মব বাহিনী দেশজুড়ে সংস্কৃতি নির্মূলের মিশনে নেমেছিল। তারা কনসার্ট বন্ধ করেছে, শিল্পীদের কাজে হামলা করেছে, বাউলদের ওপর হামলা করেছে। এ পরিস্থিতিতে নাটক, সিনেমা এবং সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর আবার প্রাণ ফিরেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সাংস্কৃতিক কর্মীদের আশা, নতুন সরকার মুক্তচিন্তা লালন করবে। সাংস্কৃতিক চর্চা আগের মতো বাধাগ্রস্ত হবে না। এ আশায় বুক বেঁধে ঈদ উদ্‌যাপন করছেন দেশের শিল্পী এবং কলাকুশলীরা।

গব মিলিয়ে এবারের ঈদ উৎসব অন্যরকম। বাংলাদেশের বুক থেকে যেন পাথর সরে গেছে। বাংলাদেশ গত দেড় বছর শ্বাস নিতে পারেনি। ভয়ে কুঁকড়ে ছিল। এক চরম নৈরাজ্য আর ভয়াবহ অরাজকতা চলেছে দেশজুড়ে। সে অবস্থার অবসান হয়েছে। এ আনন্দই বা কম কী। আগামীর বাংলাদেশে আর যা-ই হোক, এর চেয়ে অন্ধকার রাত যেন আর না আসে, সেই প্রার্থনায় হোক এবারের ঈদ উদ্‌যাপন।

সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন



Our Like Page