ট্রেনে ঈদযাত্রার ছবি পোস্ট করে এক সরকারি চাকরিজীবী লিখেছেন, ‘মবের ভয়ে দুই ঈদ বাবা-মার সঙ্গে করতে পারিনি।
গত বছরের দুটি ঈদ ভুলে যেতে চাইবেন বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধান, রাষ্ট্রপতি। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, কী দুঃসহ সময় কেটেছে তাঁর গত দুই ঈদে।
গত বছর ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ছিল চোখে পড়ার মতো। বেতন-ভাতার দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তায় নামেন।
হামলা, লুটপাটের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বেতন দিতে পারেনি মালিকপক্ষ। আবার অনেক উদ্যোক্তা মবের ভয়ে কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছিলেন। লাখ লাখ শ্রমিকের গত ঈদ কেটেছে অনাহারে, ভিক্ষাবৃত্তি করে। তাঁরা ঈদে হাসতে পারেননি, তাঁদের ঈদ ছিল কান্নাভেজা।
দেড় বছরের বিনিয়োগবিনাশী সরকারের বিদায়ের পর মালিকরা নতুন করে আবার সবকিছু শুরুর অপেক্ষায়। শ্রমিকরাও আশায় বুক বেঁধে আছেন। নতুন সকালের অপেক্ষায়। সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে এমন আশা করছেন মালিক-শ্রমিক সবাই। এবার ঈদ তাঁদের জন্য স্বস্তির। একজন শ্রমিক বলছিলেন, ‘কীভাবে দেড়টা বছর পার করেছি আল্লাহ জানেন। এমন খারাপ সময় যেন আর কখনো ফিরে না আসে কারও জীবনে।’
মাত্র এক মাসে কোনো বড় পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের মনে ভয় আর আতঙ্ক কেটে গেছে। সবাই নতুন করে স্বপ্ন দেখছে। নতুন করে শুরুর প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করেছে। এবারের ঈদ তাই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন সৃষ্টির সূচনা।
গত দেড় বছরে দুটি ঈদে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্যও ছিল অন্ধকার সময়। একজন দোকানি বলছিলেন, ‘চাঁদাবাজদের অত্যাচারে গত দুই ঈদে ব্যবসা করতে পারিনি। এবার সেই চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য নেই।’
গত দেড় বছর গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করে রাখা হয়েছিল। তার পরও ঈদে চাঁদাবাজি, শপিং মলে হামলার খবরগুলো এখনো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মনে জাগরূক। সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, টানাপোড়েনের মধ্যেও মানুষ তার শেষ সম্বলটুকু দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে চাইছে। এটা কেবল ঈদ উৎসব নয়, এ যেন মুক্তির উদ্যাপন।
বিগত দেড় বছরে গণমাধ্যমের অবস্থা কী ছিল, তা বোঝা যায় বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক এ. কে. এম. মন্জুরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর লেখা থেকেই। সম্প্রতি জেল থেকে মুক্তি পাওয়া আলোচিত সাংবাদিক আনিস আলমগীরের বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, ড. ইউনূস সরকারের আমলে গণমাধ্যমের নিপীড়ন ও কণ্ঠরোধের ভয়াবহ চিত্র। এবারের ঈদ তাই গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অন্যরকম আনন্দের।
‘আমাদের সেই ১৮ মাস’ শিরোনামে সাড়াজাগানো লেখায় মন্জুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘অন্তর্র্বর্তী সরকারের ১৮ মাস আমরা সরকারের কারণে ভয়াবহ চাপে ছিলাম। বৈষম্যবিরোধী নামধারী কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষের মবের শিকার হয়েছি।’ আনিস আলমগীর মুক্তির পর ডয়েচে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে বেশি। সংবাদপত্রে কে চাকরি করবে, না করবে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা। যে-কেউ যেকোনো পত্রিকা অফিসে মব করতে পারে।’
দলমতনির্বিশেষে সব গণমাধ্যমকর্মীর জন্য তাই এবারের ঈদ উৎসবের, মুক্তির। যাঁরা এতদিন আতঙ্কের মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাঁদের আতঙ্ক কিছুটা হলেও কম হয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকার আর যা-ই হোক, ইউনূস সরকারের মতো গণমাধ্যমের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াবে না, এমনটাই আশা করছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
খেলাধুলায় ধ্বংসের তাণ্ডব চালিয়েছে ইউনূস সরকার। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের মতো আসরে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? এবার ক্রীড়াবিদদের জন্য নিশ্চয়ই স্বস্তির ঈদ। এমন ক্রীড়াবিদ্বেষী সরকার যেন না আসে সেই কামনা করবেন সব খেলোয়াড় এবং সমর্থক এ ঈদে। এবারের ঈদ তাঁদের জন্য দুঃসহ স্মৃতি ভোলার উপলক্ষ।
গত দেড় বছরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ছিল ভয়, দমবন্ধ অবস্থা। ইউনূস সরকারের আশকারা পেয়ে দানব হয়ে ওঠা মব বাহিনী দেশজুড়ে সংস্কৃতি নির্মূলের মিশনে নেমেছিল। তারা কনসার্ট বন্ধ করেছে, শিল্পীদের কাজে হামলা করেছে, বাউলদের ওপর হামলা করেছে। এ পরিস্থিতিতে নাটক, সিনেমা এবং সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অন্তর্র্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর আবার প্রাণ ফিরেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সাংস্কৃতিক কর্মীদের আশা, নতুন সরকার মুক্তচিন্তা লালন করবে। সাংস্কৃতিক চর্চা আগের মতো বাধাগ্রস্ত হবে না। এ আশায় বুক বেঁধে ঈদ উদ্যাপন করছেন দেশের শিল্পী এবং কলাকুশলীরা।
গব মিলিয়ে এবারের ঈদ উৎসব অন্যরকম। বাংলাদেশের বুক থেকে যেন পাথর সরে গেছে। বাংলাদেশ গত দেড় বছর শ্বাস নিতে পারেনি। ভয়ে কুঁকড়ে ছিল। এক চরম নৈরাজ্য আর ভয়াবহ অরাজকতা চলেছে দেশজুড়ে। সে অবস্থার অবসান হয়েছে। এ আনন্দই বা কম কী। আগামীর বাংলাদেশে আর যা-ই হোক, এর চেয়ে অন্ধকার রাত যেন আর না আসে, সেই প্রার্থনায় হোক এবারের ঈদ উদ্যাপন।
সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন