মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন

ভোটের উত্তাপের পর নাহিদের বাসায় তারেক রহমানের এক ভিন্ন রাত

রাত ৮টা ২৭ মিনিট। রাজধানীর ৫ সার্কিট হাউজ রোড। নিত্যদিনের মতোই শান্ত। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই নীরবতার ভাঁজে জমতে থাকে কৌতূহল, প্রত্যাশা আর অদ্ভুত এক উষ্ণতা

গন্তব্য জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এর বাসভবন। উপলক্ষে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ।

তবে এ কোনো চিরচেনা রাজনৈতিক সফর ছিল না। বাড়ির সামনে ছিল না রণহুঙ্কার, ছিল না কটাক্ষ কিংবা প্রতিহিংসার ইঙ্গিত।

বরং ছোট ছোট শিশুদের হাতে গোলাপ, তরুণীদের হাতে বই, আর প্রতিবেশীদের চোখে একপলক দেখার আকাঙ্ক্ষা; এমন দৃশ্য যেন গত কয়েক দশকের রূঢ় রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নিঃশব্দে প্রশ্ন করছিল। 

গাড়ি থেকে নামতেই অপেক্ষমাণ মানুষদের ভিড় ঘিরে ধরে তারেক রহমানকে। কারও হাতে লাল গোলাপ, কারও হাতে প্রিয় বই, কারও ছোট্ট প্যাকেটে চকলেট। এক কিশোরী এগিয়ে দেয় একটি বই, মলাটে লেখা ‘BMSS Buzz’।

নিরাপত্তাকর্মীরা ভিড় সামলাতে এগোলে তারেক রহমান হাত তুলে ইশারা করেন থামতে। নিজেই এগিয়ে গিয়ে গ্রহণ করেন উপহারগুলো। 

মুহূর্তটি যেন বলে দেয় রাজনীতির প্রাচীর যত উঁচুই হোক, মানুষের ভালোবাসার দেয়াল তার চেয়েও শক্ত।

শিশুরা মোবাইল তুলে সেলফি নিতে চায়। কেউ লাজুক হাসিতে তাকিয়ে থাকে, কেউবা ফুল গুঁজে দেয় তার হাতে।

 

রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর ৫ সার্কিট হাউজ রোড ছবির ফ্রেমে ধরা পড়া তারেক রহমানের সঙ্গে নাহিদ ইসলামের প্রতিবেশীদের সেই মুহূর্তটি যেন এক ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষ্য, যেখানে নেতা ও নাগরিকের মাঝে কোনো দুর্ভেদ্য দূরত্ব নেই।

এরপর তিনি প্রবেশ করেন নাহিদ ইসলামের বাসায়। বাইরে যুবদলের স্লোগানে চারপাশ প্রকম্পিত হলেও ভেতরে ও আশপাশের বারান্দায় ছিল এক নীরব কৌতূহল। প্রতিবেশীরা জানালা ও বারান্দা থেকে উঁকি দিয়ে দেখছিলেন ইতিহাসের এক ভিন্ন অধ্যায়।

নির্বাচন-পরবর্তী উত্তাপ যখন এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি, ঠিক তখনই বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোর দ্বারে গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করছেন তারেক রহমান।

এর আগে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গেও। মতপার্থক্য থাকলেও সংলাপের পথ বেছে নেওয়ার এই উদ্যোগ অনেকের চোখে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত।

তারেক রহমানের সঙ্গে নাহিদ ইসলামের বাসায় প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক শেষে এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেনের কণ্ঠেও ঝরল সেই সৌজন্যের সুর।

আখতার হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রশ্ন থাকলেও, রাজনৈতিক সৌজন্যের জায়গা থেকে তারেক রহমান আজ যেভাবে এসেছেন, তাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। মতভিন্নতা থাকবেই, কিন্তু সমাধান আসতে হবে সংলাপের মধ্য দিয়েই।’

বৈঠকে কেবল কুশল বিনিময় নয়, রাষ্ট্র সংস্কার, কৃষি, শিক্ষা ও শিল্পনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা পেরিয়ে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় বসা এটিও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

সার্কিট হাউজ রোডের সেই রাতটি শুধু একটি বৈঠক সাক্ষী হয়ে রইল না, বরং তা হয়ে রইল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

যেখানে উপহারের গোলাপ আর বইয়ের পাতায় লেখা হলো আগামীর বাংলাদেশের গল্প। যে গল্পে প্রতিহিংসা নয়, বরং শ্রদ্ধা আর সহাবস্থানই হবে রাজনীতির মূল ভিত্তি।

রাত ৯টা ১১ মিনিটে যখন তারেক রহমানের গাড়ি বহর এলাকা ত্যাগ করছিল, তখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখেমুখে ছিল এক প্রশান্তির ছাপ।

রাজনীতির আঙিনায় এমন সৌজন্যের সুবাতাস যদি বইতে থাকে, তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার ‘নতুন বাংলাদেশ’ খুব বেশি দূরে নয়।



Our Like Page