বিএনপি ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে ও তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন– এই আভাস আগেই দিয়েছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপেও উঠে এসেছিল, বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসছে বিএনপি।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্স, বিবিসি, দ্য ইকোনোমিস্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত ১৩ জানুয়ারি রয়টার্স ‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি বিবিসি বাংলা ‘প্রধানমন্ত্রী পুত্র থেকে যেভাবে বিএনপির একক নেতায় পরিণত হলেন তারেক রহমান’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে যা ছিল
আন্তর্জাতিক ব্রিটিশ গণমাধ্যম রয়টার্স গত ১৩ জানুয়ারি ‘প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান সপরিবারে লন্ডনে চলে যান। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তার দল বিএনপির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তারেক রহমান পান বীরোচিত সংবর্ধনা। বর্তমানে শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন। তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছেন। তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নেতা এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশের শাসনভার পরিচালনা করেন।
তারেক রহমান বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নতুনভাবে গড়ে তুলতে চান, যাতে বিনিয়োগ বাড়ে। তবে কোনো একক শক্তির ওপর দেশ যেন অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’
‘প্রধানমন্ত্রী পুত্র থেকে যেভাবে বিএনপির একক নেতায় পরিণত হলেন তারেক রহমান’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি বাংলা। গত ১১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এবারই প্রথম নির্বাচনী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিলেন তারেক রহমান এবং একইসঙ্গে তিনি নিজেও এবারই প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
নির্বাচনের মাত্র মাসখানেক আগে মায়ের মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে অভিষিক্ত হয়ে তার নেতৃত্বেই দলের নির্বাচনী প্রচার ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং তার সমর্থকরা তাকেই বাংলাদেশের ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।
তার দল বিএনপিও তাকে ‘একক নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করছে, যদিও তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অতীতের দুর্নীতির অভিযোগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়গুলো সামনে এনে প্রশ্ন তুলছে।
তারেক রহমান ও তার দল বিএনপি এসব দুর্নীতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে অতীতের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর গত ডিসেম্বরে ঢাকায় ফিরে তার দলের পক্ষ থেকে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা পেয়েছেন তিনি।
মূলত এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তৈরি করা দলটি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংগঠিত ও জনপ্রিয় হওয়ার পর আবার একটি সমস্যা-সংকুল পথ পাড়ি দিয়ে তাদের বড় সন্তান তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ার সময়ে পদার্পণ করলো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আসাটা ছিল অনিবার্য, কিন্তু তার একক নেতৃত্বের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো এবারের নির্বাচন। এর ওপরই তার সাফল্য-ব্যর্থতার রাজনৈতিক পরীক্ষা শুরু হলো বলে মনে করেন তারা।
তারা বলছেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপিকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছেন তারেক রহমান, কিন্তু অতীতের সমালোচনা ও বিতর্ককে ছাপিয়ে এখন তিনি কীভাবে নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে তার দলকে নেতৃত্ব দেন, সেদিকেই সবার দৃষ্টি থাকবে।
কী বলেছিল দ্য ইকোনোমিস্ট
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দ্য ইকোনোমিস্ট ‘এমন একটি নির্বাচন, যা বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা করে’ শীর্ষক একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে।
তারেক রহমান –বয়স ৬০, খ্যাতনামা রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি– বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী।
১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনই হবে ১৮ মাস আগে ঘটে যাওয়া অভ্যুত্থানের পর প্রথম নির্বাচন, যে অভ্যুত্থানে জেন-জি আন্দোলনকারী প্রজন্ম ১৫ বছরের হত্যাকারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনের ইতি টেনেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গণতন্ত্র ফিরে এলে আইনশৃঙ্খলা উন্নত হবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জটিল সম্পর্ক মেরামত শুরু হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে রাজনীতিতে ব্যাপক হারে যে পরিবর্তনের আশা দেখেছিলেন অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রজনতা, ততটা পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা এখন আর দেখা যাচ্ছে না।
২০০৮ সালের যে নির্বাচন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় এনেছিল, এরপর বাংলাদেশ আর যথাযথ কোনো নির্বাচন দেখেনি। দেশটির ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের প্রায় ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত ভোট দেওয়ার সুযোগই পাননি। ঢাকায় অবস্থিত থিংক ট্যাংক বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) শাফকাত মু্নির বলেন, ‘জীবনের দুটি দশক কেটে গেছে যেখানে আমার ভোটের কোনো দাম ছিল না।’
এই পুরো পরিস্থিতিই তারেক রহমানের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি নির্বাচনী জরিপগুলোতে এগিয়ে। বছরের পর বছর দলটাকে সামলেছেন তার মা প্রয়াত খালেদা জিয়া। তারও আগে দল চালিয়েছেন খালেদা জিয়ার স্বামী, যিনি ১৯৮১ সালে খুন হন। খালেদা জিয়ার অধীনে বিএনপি ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তিনবার ক্ষমতায় এসেছিল, যদিও তাদের শাসনকাল প্রায়শই কলঙ্কময় ছিল। ২০০৬ সালে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করার আগে মনে হচ্ছিল তারা নির্বাচনে কারচুপি করতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়িক নেতা ও অধিকাংশ উদারপন্থি তারেক রহমানকে সমর্থন দিয়েছেন। দেশে ফেরার পর তিনি এমন সব কথা বলছেন, যা তাদের চাওয়ার সঙ্গে মিলে যায়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, লন্ডন থেকে ফেরার পরের তারেক রহমানকে আগের তারেক রহমানের চেয়ে আলাদা মনে হচ্ছে।
আইআরআই জরিপে এগিয়ে ছিল বিএনপি
বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে একটি জরিপ পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)। ‘বাংলাদেশের জাতীয় জরিপ’ শিরোনামের এই জরিপে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই বেছে নিয়েছিলেন বিএনপিকে।
এতে রাঙামাটি বাদে ৬৩ জেলায় ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ৪ হাজার ৯৮৫ জন অংশ নেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৪১০ ও নারী ২ হাজার ৫৭৫ জন। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয় গত ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত।
জরিপে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীরা বিএনপিকে এগিয়ে রাখেন। জরিপে সাধারণ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিএনপিকে ভোট দেওয়ার পক্ষে ৩০ শতাংশ। জামায়াতের ক্ষেত্রে এই হার ২৬।
আগামী নির্বাচনে ভোট দিতে চান এমন ৩ হাজার ২৭০ জন অংশগ্রহণকারীকেও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দল বাছাই করতে বলা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ বলেছেন বিএনপিকে ভোট দেবেন। ২৯ শতাংশ ভোট দিতে চেয়েছেন জামায়াতকে।