আসন্ন রাজনৈতিক সরকারের দিকে আশাবাদ নিয়ে তাকিয়ে আছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীরা। তাঁদের বিশ্বাস, চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশিবিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। তবে একই সঙ্গে তাঁরা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জগুলোর কথাও তুলে ধরছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।
এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, একটি স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারবে বিশেষ করে দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর বিনিয়োগ আস্থা এবং বহু বিদেশি ক্রেতার ‘ধীরে চলো’ অবস্থানের পর। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভূমিধস বিজয়ে নেতৃত্ব দেওয়ায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সরকারের নেতৃত্বে সংসদ শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বিশেষ করে বস্ত্রখাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান করে বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনতে তিনি নতুন সরকারের কাছে অবিলম্বে দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন এফবিসিসিআই সংস্কারের আহ্বান জানান।
তাঁর মতে, বাণিজ্য সংগঠনগুলোকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং জাতীয় অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিয়মিত পরামর্শের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে ফাইল ঘুরতে থাকলেও সময়মতো সিদ্ধান্ত না আসায় বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শওকত আজিজ রাসেল আরও বলেন, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ শতাংশ অবদান রাখা বস্ত্র খাতের নেতারাও সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে গত ১৮ মাসে মাত্র ১৮ মিনিটের সাক্ষাৎ করতে পারেননি। একই সময়ে কয়েকটি কথিত অকার্যকর ব্যাংককে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ আয়োজন ও বিপুল ভোটার উপস্থিতি ব্যবসায়ী মহলে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারকে সক্ষম করবে। তবে তাঁর মতে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই হবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকারকে জ্বালানি সংকট, ডলার সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ গুরুতর সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দুর্বলই রয়ে গেছে এবং আগের সরকার কিংবা অন্তর্বর্তী প্রশাসন কেউই কাঠামোগত অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।
তাঁর মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিশোধ ভারসাম্যের বাস্তবতা বিবেচনায় বড় উন্নয়ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বিদেশি অংশীজনদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কোনো বিতর্কিত বা বিশৃঙ্খল নির্বাচন হলে ব্যবসায়িক আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা অপরিহার্য এবং ‘মব কালচার’ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে পারে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় কয়েক মাসের অনিশ্চয়তার পর ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি ফিরেছে। নির্বাচনের এই ফলাফল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করবে এবং বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত করবে। তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, তবে আইএমএফ-সমর্থিত নীতিমালা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি তিনি জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনার ওপর জোর দেন। এ ছাড়া, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান ট্যারিফ চুক্তিগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে আসন্ন এলডিসি উত্তরণে দেশের প্রস্তুতি জোরদারের আহ্বান জানান।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন