বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ০২:৫৪ অপরাহ্ন

মুসলিম স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন বারো দুয়ারী মসজিদ

বৃহত্তর ময়মনসিংহের গর্ব ও মুসলিম স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন হলো গড় জরিপা বারো দুয়ারী মসজিদ। ১২টি দরজা থাকার কারণেই মসজিদটিকে বারো দুয়ারী মসজিদ বলা হয়। এছাড়া মসজিদটিতে আছে তিনটি জানালা ও তিনটি গম্বুজ।

জনশ্রুতি অনুযায়ী, অন্তত সাতশ বছর আগে জরিপ শাহ মসজিদটি নির্মাণ করেন।

বর্তমানে মসজিদটির যে অবস্থান, মোগল আমলে সেখানে মসজিদটি একটি সেনা ছাউনি মসজিদ বলে পরিচিত ছিল। কালের বহতাধারায় এক সময় ভূমিকম্পে মসজিদটি ধ্বংস হয়ে মাটিচাপা পড়ে। মসজিদের ওপর জমতে থাকে মাটির স্তূপ এবং আস্তে আস্তে তৈরি হয় টিলা। টিলার ওপর গজায় নানা জাতের গাছ-গাছালি।
ধীরে ধীরে তা বিশাল জঙ্গল হয়ে ওঠে। গড় জরিপা মসজিদকে আবারও ইবাদতের স্থান হিসেবে ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখলেন এক মহান দরবেশ। 

ঐতিহ্যবাহী শর্ষিণা পাকদরবারের মহান পীর সাহেবের খলিফা হয়ে শ্রীবরদীতে আগমন করলেন আজিজুল হক সাহেব। তিনি জামালপুর জেলা সদরের মানুষ।

আজিজুল হক সাহেব একদিন এক শুভ স্বপ্নযোগে গড় জরিপা মসজিদ সম্পর্কে আধ্যাত্মিক ইশরা লাভ করেন। স্বপ্নের নির্দেশনা মতো তিনি গড় জরিপা এলাকায় গিয়ে উঁচু ঢিবি খুঁজতে থাকেন। গ্রামের বয়োবৃদ্ধ লোকজনের সঙ্গে আলাপে তিনি জানতে পারলেন গ্রামের ওই উঁচু ঢিবি বা টিলার ওপরের গাছ-গাছালির বিশাল জঙ্গলে একসময় মসজিদ ছিল, যা স্থানীয়দের উচ্চারণে ‘মজিদের আড়া’। আজিজ সাহেব তার স্বপ্নের কথা এলাকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করলেন এবং মুরিদদের নিয়ে মাটি খনন করতে লাগলেন। তারা জঙ্গল পরিষ্কার করে মাটির কয়েক গজ গভীরেই এক প্রাচীন মসজিদের অস্তিত্ব খুঁজে পান ১৯৬৩ সালে।
মসজিদের ইটগুলো গোলাপ ফুলের নকশা খোদাইকৃত ছিল। 

বারো দুয়ারী মসজিদগড় জরিপা বারো দুয়ারী মসজিদের খতিব মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন দুর্লভ মসজিদের গোলাপ ফুলের নকশা খোদাইকৃত ইটগুলো ১৯৬৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নিয়ে যায়। এবং তখন থেকেই মসজিদটিতে পুনরায় ইবাদত বন্দেগি শুরু হয়। হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিবিজরিত ও প্রাচীন বারো দুয়ারী মসজিদ খুঁজে পাওয়ার পর বহুবার সংস্কার ও সম্প্রসারণের ফলে বর্তমানে এ রূপ পেয়েছে। এতে শিল্পীর ছোয়ায় প্রাচীন ও আধুনিকতার চমৎকার সমন্বয়ে রূপ ফুটে উঠেছে। অপরূপ প্রত্ন নিদর্শন বারো দুয়ারী মসজিদ ইবাদত ও ঐতিহ্যের আবহে পর্যটক আকর্ষণে বিশাল অবদান রাখতে পারে। মাটি খুঁড়ে ও জঙ্গল পরিষ্কার করে ১২টি দরজাসহ মসজিদটি খুঁজে পাওয়া যায়। তাই মসজিদটির নাম দেন বারো দুয়ারী মসজিদ। পুরোনো মসজিদের বারোটা দরজা ছিল। কিন্তু পুরাতন মসজিদটি আস্তে আস্তে নষ্ট হচ্ছে বলে নতুন মসজিদেও সেটার মতো ১২টি দরজা রাখা হয়েছে যাতে ঐতিহ্যটা না হারায়।

গড় জরিপা বারো দুয়ারী মসজিদের সভাপতি ওসমান গনি বলেন, এই মসজিদে তিন-তলা পর্যন্ত নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আর প্রতি ওয়াক্ত ৫০-১০০ জন মুসল্লি নামাজ পড়েন। কিন্তু শুক্রবার জুমার দিনে পুরো মসজিদ ভরে যায় সেসময় ১৫০০-২০০০ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়েন। মসজিদটির পাঁচ তলা পর্যন্ত কাজ চলমান রয়েছে। সামনে পুকুর ভরাট করে সেখানে মহিলাদের জন্য নামাজের ব্যবস্থা করা হবে। এটা একটা গায়েবি মসজিদ। স্বপের মসজিদ। এটার অনেক গুনাগুন রয়েছে বিধায় এখানে অনেক দান খয়রাত আসে।

বারো দুয়ারী মসজিদআগে মানুষজন মান্নত করে এই মসজিদে পুরুষ-মহিলা মিলেমিশে দূর-দূরান্ত থেকে এসে সিন্নি করতো। আর তা নিজেরা খেত আশপাশের মানুষদের বিলাত। কিন্তু এটি করার ফলে নারীরা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করত। পিকনিক স্পটের ময়লা আবর্জনা ফেলে রেখে যেত। আর এতে মসজিদের পরিবেশ ও ইবাদতের সমস্যা সৃষ্টি হতো। তাই আমরা সিন্নির সিস্টেম বন্ধ করে দিয়েছি। এখন সিন্নির টাকা মসজিদের উন্নয়ন কাজের জন্য দান হিসেবে নেওয়া হয়। এতে করে মসজিদের আয়ও বেড়েছে। এখন বর্তমানে মানুষের দানের টাকায় মসজিদটির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। অতিদ্রুত কাজ আগাতে পারতেছি। আর এখানে সরকারিভাবে ওই রকম কোনো দান-অনুদান আমরা পাই না। সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো।

শুক্রবার সরেজমিনে মসজিদটিতে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদটিতে দূর-দূরান্ত থেকে হাজারও মুসল্লি নামাজ পড়তে এসেছেন। আর পুরুষ ও নারীরা এসেছেন মান্নতের দান করতে। দানবাক্সে মান্নতের টাকাও দিচ্ছেন নারী-পুরুষরা। মসজিদের সামনের স্কুল মাঠে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার সারি।

শেরপুর শহর থেকে আসা মো. নাহিদ বলেন, শুক্রবার তো তাই বন্ধুরা মিলে এখানে নামাজ পরতে আসছি। এটা স্বপ্নে দেখানো মসজিদ। আর এখানে বন্ধুদের সবার ইচ্ছে ছিলো একসঙ্গে নামাজ পরবে তাই আজকে আসা।

আরেক মুসল্লি নকলা থেকে আসা রিমন মিয়া বলেন, আমাদের এলাকায় অনেক মসজিদ রয়েছে তবে অনেকদিনের আশা ছিল এখানে নামাজ পরবো। তাই আজকে ভাগিনাকে নিয়ে আসছি নামাজ পরতে। অনেকে মান্নত করেও আসে।

আরেক মুসল্লি রায়হান মিয়া বলেন, এই মসজিদে ১২টা দরজা রয়েছে বলে এর নাম বারো দুয়ারী মসজিদ। আমরা নিজেরা গুনে দেখেছি। স্বপ্নের এই গায়েবী মসজিদে অনেক লোক আসে নামাজ পড়তে, মান্নত করতে।



Our Like Page