বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:১১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
ঘরেই বানান ময়েশ্চারাইজার এআই-রোবটিক্সের ব্যবহার বিদ্যুৎ খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে: উপদেষ্টা সৈয়দপুরে লাঙ্গল প্রতীকের নির্বাচনী অফিসে হামলা, আহত ৯ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই: শামা ওবায়েদ আইসিসিকে জবাব দিতে পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের প্রসঙ্গ টানলেন নকভি এক বছরের নিষেধাজ্ঞায় কলি আইসিসি এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল, যেগুলো আমরা ম্যানেজ করেছি: বুলবুল প্রশান্ত মহাসাগরে নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে ‘অপতথ্যের বন্যা’ জাপানের নির্বাচনে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত তাকাইচি

নির্বাচনের ফলাফল কি মেনে নেবে সব দল?

১২ ফেব্রুয়ারি বহুলপ্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত নির্বাচন হবে এই ভোটের লড়াই। এ নির্বাচনে কে জিতবে, জয়পরাজয়ের হিসাবনিকাশ চলছে সর্বত্র। আগামী পাঁচ বছরের জন্য জনগণ কাকে দেবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ভোট গণনার পর।

কিন্তু আমরা সাধারণ নাগরিকরা উৎকণ্ঠিত অন্য কারণে। নির্বাচনের ফলাফল কি মেনে নেবে সব রাজনৈতিক দল? ফলাফল যদি পরাজিত দল মেনে না নেয়, তাহলে কি আবারও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে? আবারও কি সহিংসতা শুরু হবে নতুন করে? এ ধরনের আতঙ্কের কারণ আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনের ফলাফল পরাজিত পক্ষ মেনে নেয়নি। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি সংসদ নির্বাচনের কোনোটিই সব রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
তিনটি সংসদ নির্বাচনকে মনে করা হয় মোটামুটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। এগুলো হলো ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১-এর নির্বাচন। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ তিনটিকে ভালো নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এ তিনটি নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও পরাজিত দল প্রশ্ন তুলেছিল।
’৯১-এর নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগ তোলে। ’৯৬-এর নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিএনপি অভিযোগ করে, নির্বাচনে কারচুরি হয়েছে। ২০০১-এর নির্বাচনের পর পরাজিত আওয়ামী লীগ ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ করে। এবার নির্বাচনের পর কী হবে? এবারের নির্বাচনি প্রচার ছিল উত্তেজনাপূর্ণ, আক্রমণাত্মক। নির্বাচনে প্রধান দুই দলই কারচুপির শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
বিএনপি এবং জামায়াত উভয় দলই ভোট কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জনগণকে। দুই দলই সতর্ক করে দিয়েছে যে নির্বাচনে কারচুপি হলে বরদাশত করা হবে না। তাই নির্বাচনের ফলাফল পক্ষে না গেলে পরাজিত দলের প্রতিক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এ রকম পরিস্থিতি কল্পনাও করা যায় না। উত্তপ্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনি প্রচার শেষে ফলাফল ঘোষণা হলে সব পক্ষ তা মেনে নেয়। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে অভিনন্দন জানায়। নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন পরাজিত দলের নেতারা। কিন্তু বাংলাদেশে সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। তাই নির্বাচনের পর শুরু হয় নতুন করে বিতর্ক এবং অস্থিরতা। পরাজিত দল নিত্যনতুন ইস্যু তৈরি করে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত করে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। এবারের নির্বাচনের পর আমরা তেমন কিছু চাই না। আমরা চাই নির্বাচনের পর পরাজিত দল বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানাবে। পরাজিত দলের কাছে ফুল নিয়ে যাবেন বিজয়ী দলের নেতা। নতুন বাংলাদেশে এ সংস্কৃতির চর্চা শুরু হোক, এটাই সবার প্রত্যাশা। 

আর এ সংস্কৃতি তখনই শুরু করা সম্ভব হবে যখন নির্বাচন কমিশন একটি দৃশ্যমান ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারবে। এজন্য নির্বাচন কমিশনকে পক্ষপাতহীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনকে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করতে কমিশনকে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। অতীতের নির্বাচনকেন্দ্রিক বিতর্কগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কমিশনের অদক্ষতা, পক্ষপাতিত্ব এবং মাঠপর্যায়ে অতি উৎসাহী নির্বাচন কর্মকর্তাদের কারণে নির্বাচন বিতর্কিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বিশেষ একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছে। বিশেষ দলকে জেতানোর জন্য মাঠপর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়ারও নজির আছে অতীতে। এসব বিষয়ে এবার কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ, এটা কাজে প্রমাণ করতে হবে। সাধারণত পাঁচটি কারণে নির্বাচন বিতর্কিত হয়। প্রথমত নির্বাচনের দিন সহিংসতা। জোরপূর্বক কেন্দ্র দখল, সাধারণ ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা দেওয়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন। দ্বিতীয়ত জাল ভোট প্রদান ও কারচুপি। তৃতীয়ত প্রিসাইডিং অফিসারসহ অন্য কর্মকর্তাদের কোনো বিশেষ প্রার্থীর পক্ষে প্রভাবিত হয়ে কাজ করা। চতুর্থত ভোটের ফলাফল গণনায় কারচুপি এবং ভোট গণনায় বিলম্ব। এবং নির্বাচনের পর ব্যালট বাক্স ও কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা। নির্বাচন কমিশন যদি দৃঢ় অবস্থান নেয় তাহলে এ ধরনের পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো সম্ভব। এবার নির্বাচন কমিশন বারবার বলেছে তারা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচন পরিচালনা করবে। এ দেশের মানুষ এটা দেখতে চায়। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকলেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। আর নির্বাচন যদি জনগণের কাছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুষ্ঠু হিসেবে স্বীকৃত হয়, তাহলে পরাজিত দলের কারচুপির অভিযোগ ধোপে টিকবে না। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তারা আন্দোলন করতে চাইলেও জনগণ তাতে সাড়া দেবে না। এ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। হারলেই কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে তাদের। দলগুলো নির্বাচনের বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী হলেও পরাজয় মেনে নিতে ভীষণ অনিচ্ছুক। পরাজিতদের দুটি শ্রেণি-প্রার্থীর পরাজয় এবং সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন না পেয়ে দলীয় পরাজয়। সাধারণত দল সরকার গঠন করতে না পারলেই পুরো নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে অস্থিতিশীল করে তোলা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেও সব নির্বাচনে এমনটা দেখা গেছে। জিতলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু আর হারলে কারচুপি-এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এ নির্বাচন যেন গণতন্ত্রের অভিযাত্রার নবসূচনা করে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, দেশের অবস্থা ভালো নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষ চরম উদ্বিগ্ন। মবসন্ত্রাস, চাঁদাবাজির কারণে মানুষ রীতিমতো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। গত ১৮ মাসে বেকারত্ব বেড়েছে, হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন বিনিয়োগ নেই। ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তারা অপেক্ষা করছেন। তাঁদের আশা নির্বাচনের পর দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। কিন্তু নির্বাচনের পর যদি পরাজিত পক্ষ নতুন করে আন্দোলন শুরু করে, তাহলে দেশের মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। বাংলাদেশে জরুরি ভিত্তিতে স্থিতিশীলতা, মবতন্ত্রের অবসান, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আশা করি নির্বাচনের ফলাফলের পর সবাই জনগণের রায় মেনে নেবেন। বিজয়ী দল এবং বিরোধী দল সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করবে। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রে সরকারি দলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো বিরোধী দল। একটি কার্যকর এবং শক্তিশালী বিরোধী দল যেমন সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে, তেমন সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করে। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দল ছায়া সরকার গঠন করে। যার মাধ্যমে সরকারের সমস্ত কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হয়। সরকারের ভুলত্রুটির সমালোচনা করা ছায়া সরকারের কাজ। এর ফলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। মানুষ সরকারের কাজকর্ম মূল্যায়ন করার সুযোগ পায়। শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে গণমাধ্যমও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারবে। সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা করতে পারবে। গোটা দেশে একটি মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে। তাই এ নির্বাচনে যারা বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, তাদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী বিরোধী দল সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। এর ফলে দেশ এগিয়ে যাবে। তাই সরকার গঠন না করতে পারলেই সবশেষ, এমনটি ভাবার কারণ নেই। সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেই মানি না, মানব না বলার প্রয়োজন নেই। দরকার নেই নির্বাচন বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করার। বরং সত্যিকারের একটি শক্তিশালী বিরোধী দল চায় জনগণ। যারা সরকার গঠন করবে আর যারা বিরোধী দল হবে তারা সবাই জয়ী। আসল বিজয়ী জনগণ।

এ দেশের মানুষ আর প্রতিহিংসা চায় না, আর হানাহানি চায় না। আতঙ্ক আর ঘৃণার রাজনীতির অবসান হোক এ নির্বাচনের মাধ্যমে। আমাদের মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তার প্রকাশ হতে হবে শালীনতার মধ্যে। আমরা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হব। সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। ১২ ফেব্রুয়ারিতে হোক নতুন বাংলাদেশের শুরু।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন



Our Like Page