কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের জীম্বংখালী সংলগ্ন নাফ নদীতে মায়ানমার অভ্যন্তর থেকে আরাকান আর্মির ছোড়া গুলিতে নবম শ্রেণির স্কুল ছাত্রসহ দুই কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধরা হলেন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কানজর পাড়া এলাকার বাসিন্দা শেখ কামালের ছেলে মোহাম্মদ সোহেল (১৬) এবং একই এলাকার মোহাম্মদ ইউনুছের ছেলে ওবায়ইদ উল্লাহ (১৭)। তিনি হোয়াইক্যং কানজর পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে হোয়াইক্যং জীম্বংখালী বিওপির পূর্ব পাশে নাফ নদী সীমান্তবর্তী কেওড়া বাগানে লাকড়ি সংগ্রহ করতে যান সোহেল ও ওবায়দুল্লাহ। এ সময় হঠাৎ মায়ানমার সীমান্তের দিক থেকে আরাকান আর্মির ছোড়া গুলিতে তারা দু’জন গুলিবিদ্ধ হন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ মায়ানমার জলসীমায় ছোট বড় পাঁচটি দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের জলসীমায় থাকা হসরদ্বীপ, বিলাসীর দ্বীপ, কোসর দ্বীপ, শাহজাহান দ্বীপ ও রইক্ষং দ্বীপে একাধিক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর অবস্থান রয়েছে।
এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ), যার প্রধান হিসেবে পরিচিত নবী হোসেন, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), রোহিঙ্গা ইসলামী মাহাস (আরআইএম)।
অন্যদিকে নাফ নদীর মায়ানমার জলসীমায় অবস্থিত তোতার দ্বীপে অবস্থান করছে আরাকান আর্মি। এসব দ্বীপকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে নিয়মিত গোলাগুলি চলছে।
গুলিবিদ্ধ আহত সোহেলের মামা মো. ইউসুফ জানান, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সোহেল ও ওবাইদ উল্লাহকে উখিয়া কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোহেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সোহেলের বাম পা ও হাতে গুলি লাগে এবং ওবায়দুল্লাহর মাথায় গুলি এসে লাগে। বর্তমানে দু’জনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহজালাল বলেন, কয়েকদিন আগে সীমান্ত পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও মাঝখানে তা কিছুটা শান্ত ছিল। তবে আজ আবার আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে, এতে স্থানীয় দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ও মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট অলক বিশ্বাস জানান, সকালে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কানজর পাড়া এলাকায় সন্ত্রাসীদের মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনায় দুইজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তারা বর্তমানে শঙ্কামুক্ত।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে যাতে কেউ সীমান্ত এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল না করেন। পাশাপাশি আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে স্থানীয়দের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
উখিয়া ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম, জি জানান, সকাল ১১টার দিকে হোয়াইক্যং সীমান্তে নাফ নদীর প্রায় ৫০০ গজ ওপারে মায়ানমার অভ্যন্তর থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর দুইজন যুবক গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে একজনের মাথায় এবং অন্যজনের পায়ে গুলি লাগে।
তিনি বলেন, পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তারা ঘটনার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সীমান্তের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১১ জানুয়ারি মিয়ানমার দিক থেকে ছোড়া গুলিতে হোয়াইক্যং লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় গুরুতর আহত হয় ১২ বছরের বাংলাদেশি শিশু আফনান। সে ঢাকা আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনন্সিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এর পরদিন ১২ জানুয়ারি হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকা নাফ নদীতে দ্বীপে মাছের প্রজেক্টে করতে গিয়ে আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে গুরুতর আহত হন মো. হানিফ (২৮)। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন মো. হানিফ। এই দুই ঘটনায় পুরো এলাকায় ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।