মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৬:১৫ অপরাহ্ন

সব কুশীলব গোয়েন্দা জালে

গোয়েন্দা জালে ওয়ান-ইলেভেনের সব কুশীলব। আপাতত সেখানে রেখেই যাচাইবাছাই হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের। সত্যতা মিললে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে তাদের। এরই অংশ হিসেবে গত রবিবার দিবাগত রাতে রাজধানীর ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল আবজাল নাছেরকে।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে তাকে নেওয়া হয়েছে ছয় দিনের রিমান্ডে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওয়ান-ইলেভেন এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সময় গুম, খুন, জোরপূর্বক অর্থ আদায় এবং প্রতারণার অভিযোগে আরও এক ডজন কর্মকর্তাকে কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তথ্য যাচাইয়ের জন্য ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত অনেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। প্রয়োজনে তাদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সূত্র।
 

সূত্র বলছে, এক ডজন কর্মকর্তার অনেকেই বর্তমানে দুবাই, আমেরিকা, মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তবে তাদের ফেরানোর জন্য ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্নার থেকে সবুজ সংকেত পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

সূত্র আরও বলছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন তৎকালীন মেজর সুলতানুজ্জামান সালেহ।

শুরুতে তাকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরে (ডিজিএফআই) এটাচমেন্টে নিয়ে আসেন মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন। ‘জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল’ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা হয়। তিনি সারা দেশে ব্যাটালিয়ন অধিনায়কদের সঙ্গে অপারেশন সমন্বয় করতেন। অনেক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সমন্বয় করতেন তিনি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর তিনি ডিজিএফআইতে সিটিআইবির কর্নেল ‘জিএস’ হিসেবে পদোন্নতি পান।
সবশেষ মেজর জেনারেল হয়ে অবসরে যান। ইভিএম মেশিন কেলেঙ্কারিসহ নানা গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে সালেহর বিরুদ্ধে। 

সূত্রের দাবি, ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, এটিএম আমিন এবং গ্রেপ্তার মামুন খালেদ অন্তত ছয়জন কর্মকর্তাকে বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ডিজিএফআইতে এটাচমেন্টে নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার আসামি কর্নেল মাহফুজের দুই সন্তানও ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৮-এর ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্টের জন্য তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার মামুন খালেদকে আনসার বাহিনীতে পদায়ন করা হয়। নীল নকশার নির্বাচনের জন্য দেওয়া বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করেন তিনি। জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনের নেপথ্য কারিগর এবং পরবর্তী নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত দেড় ডজন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। এই তালিকায় সশস্ত্র বাহিনীর চারজন বাহিনী প্রধানের নাম রয়েছে। তারা ওয়ান-ইলেভেনে দেশকে বিরাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়ে নিজের আখের গুছিয়েছিলেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে থাকা গ্রেপ্তার দুজন সাবেক লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং শেখ মামুন খালেদ এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, মাসুদ এবং মামুন নানা কৌশল করে অনেক কিছুই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায় করা গেছে। এগুলোর সত্যতা যাচাইবাছাই করা হচ্ছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আবজাল নাছের অনেক কিছুর সঙ্গেই জড়িত ছিলেন। আদালতের নির্দেশে মাত্র রিমান্ডে আনা হলো। যেহেতু তিনি অনেক কিছুর সাক্ষী, তাই তার কাছ থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে দেননি নাছের : খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেননি ডিজিএফআইর সাবেক পরিচালক, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) মো. আফজাল নাছের। গতকাল আদালতে রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক এই তথ্য তুলে ধরে বলেন, আফজাল নাছের ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন। মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের আমলে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ীদের অত্যাচার করেছিল। বিশেষ করে বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে আবদুল আউয়াল মিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবর, মোসাদ্দেক আলী ফালুকে মিথ্যাচার করে গ্রেপ্তারের টিমে ছিলেন আফজাল নাছের। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করা টিমের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারের পর অত্যাচার করেও জিঘাংসা শেষ হয়নি ফ্যাসিস্ট হাসিনার। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে আটকে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। নিরুপায় হয়ে তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি (নাছের) খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে দেননি। সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত হয়েও নাছের নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসিনাকে রক্ষা করার জন্য কাজ করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তার সাত দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করেছি। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. হাসিব উল্লাহ পিয়াসের আদালতে জুলাই আন্দোলনের সময় দেলোয়ার হত্যা মামলায় আফজাল নাছেরকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদনের শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী হেলাল উদ্দিন রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিন প্রার্থনা করেন। দেলোয়ার হত্যা মামলার নথিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের ৫০০-৭০০ নেতা-কর্মী। এ সময় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল শেখ মামুন খালেদের নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। তাতে গুলিবিদ্ধ হন দেলোয়ার হোসেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২১ জুলাই শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন



Our Like Page