বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ন

ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষে নিহত কুমিল্লার প্রবাসী শাহ আলমের মরদেহ দেশে

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন তিনি। জীবিকার তাগিদে বহু বছর আগে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রবাসে, স্বপ্ন ছিল সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানো।

সেই মানুষটিই শেষ পর্যন্ত ফিরলেন নিথর দেহে, একটি কফিনে বন্দি হয়ে। যে হাতে ছিল পরিবারের ভবিষ্যতের দায়িত্ব, সেই হাতই আজ চিরতরে স্তব্ধ।
 

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহতের পর আকাশ থেকে পড়া ধ্বংসাবশেষের আঘাতে নিহত বাংলাদেশি প্রবাসী শাহ আলম ভূঁইয়ার মরদেহ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দেশে পৌঁছেছে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর খবরে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক।

 

এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ইকে-০৫৮০ ফ্লাইটে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে তার মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। মরদেহের সঙ্গে দেশে ফেরেন তার শ্যালক শরিফুল, যিনি পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করে আসছিলেন।

বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। 

বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেইটে সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলেন নিহতের স্বজনরা। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার খালা মানেমা, যিনি ছোটবেলা থেকে শাহ আলমকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন। প্রিয় ভাগ্নের নিথর দেহ কফিনে ফিরে আসার দৃশ্য দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন, চারপাশের পরিবেশও হয়ে ওঠে ভারী ও শোকাবহ।

নিহত শাহ আলম ভূঁইয়া (৫০) কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের জিরুইন গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় এক দশক ধরে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ’র দিব্বা এলাকায় একটি খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে তিনি খুব বেশি দেশে ফিরতে পারেননি, পরিবারকে ভালো রাখার তাগিদেই কাটিয়েছেন দূর দেশে।

স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়েসহ পুরো পরিবারের দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা—সবকিছুই চলত তার উপার্জনের ওপর নির্ভর করে। পরিবারের সদস্যদের মতে, নিজের কষ্টের কথা না বলে সবসময় চেষ্টা করতেন প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটাতে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১ এপ্রিল সকালে প্রতিদিনের মতো কাজে যাওয়ার সময় খামার এলাকায় হঠাৎ আকাশ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়ে। আশপাশে তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মারা যান শাহ আলম, কোনো ধরনের চিকিৎসার সুযোগও পাননি তিনি।

শাহ আলমের বড় ভাই খুরশেদ আলম বলেন, ভাই তো আর ফিরবে না। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা তার পরিবার নিয়ে। সরকার যদি কোনো সহায়তা করে, তাহলে তার স্ত্রী-সন্তানরা হয়তো বাঁচতে পারবে। তার কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব আর ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

তিনি আরও জানান, দীর্ঘ প্রবাসজীবনেও শাহ আলম তেমন কোনো সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারেননি। সংসারের খরচ, নিজের অসুস্থতা এবং পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়েই প্রায় সব উপার্জন শেষ হয়ে যেত। ফলে মৃত্যুর পর পরিবারটি আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

পরিবার জানায়, শাহ আলমের সঙ্গে থাকা আরেক বাংলাদেশির মাধ্যমে প্রথমে মৃত্যুসংবাদ আসে। পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনরা বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন।

এদিকে, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী সেখানে জড়ো হতে থাকেন, সবাই অপেক্ষা করেন শেষবারের মতো তাকে দেখার জন্য।

স্থানীয়দের ভাষ্য, শাহ আলম ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, নিরীহ ও পরিবারমুখী মানুষ। নিজের কষ্ট গোপন রেখে তিনি সবসময় পরিবারের কল্যাণে কাজ করেছেন। প্রবাসজীবনের কষ্ট, দূরত্ব আর অনিশ্চয়তা সহ্য করেছিলেন শুধুমাত্র প্রিয়জনদের ভালো রাখার জন্য।

পরিবারের দাবি, শাহ আলম আর ফিরে আসবেন না—এটাই বাস্তবতা। তবে তার স্ত্রী-সন্তানদের ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তায় না পড়ে, সেজন্য সরকারি সহায়তা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।



Our Like Page