২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা দখলের আগে যাঁরা এ ধরনের একটি সরকারের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেছিলেন, যাঁরা এ সরকারের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন তাঁরা কারা? সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সুশীল সমাজের মুখপত্র দুটি সংবাদপত্র এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ ও কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ এ দেশে দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেন। অনেকেই মনে করেন, এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্যই ২০০৬ সালে ড. ইউনূসকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাঁর আত্মজীবনী ‘মাই লাইফ’-এ বলেছেন, ইউনূস যেন নোবেল পুরস্কার পান সেজন্য তিনি সুপারিশ করেছিলেন। স্মরণ করা যেতে পারে, দেশিবিদেশি ষড়যন্ত্রে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত এবং সংঘাতপূর্ণ, ঠিক তখনই গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নোবেল পুরস্কার দিয়ে তাঁকে বাংলাদেশের জনগণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা হয়। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রাজনীতিমুখী হয়ে ওঠেন ড. ইউনূস। ‘নাগরিক শক্তি’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। দল গঠনে জনমত গড়ে তোলার জন্য ইউনূস তিনটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। যার সব কটি ডেইলি স্টারে প্রকাশিত হয়েছিল।
দেশের প্রধান দুটি দলের মুখোমুখি অবস্থানকে উসকে দিয়েছিল সুশীল সমাজের মুখপত্র সংবাদপত্র দুটি। রাজনৈতিক দলগুলো যেন কোনো অবস্থাতেই সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারে সেজন্য একযোগে কাজ করে এ সংবাদপত্র দুটি এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ। এভাবেই এক-এগারোর পটভূমি তৈরি করা হয়। এক-এগারো সরকারে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রথম পছন্দ ছিলেন ড. ইউনূস। সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের গ্রন্থে পাওয়া যায়, ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হওয়ার জন্য ড. ইউনূসকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দুই বছর তাঁর লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট সময় নয়, এ যুক্তিতে তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তাঁর পরামর্শেই ফখরুদ্দীন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা হয়েছিল। অর্থাৎ ২০০৭ সাল থেকেই ড. ইউনূসের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আকাক্সক্ষা ছিল। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়ে প্রথম ১০ মাস নির্বাচনের বিরুদ্ধে ছিলেন। জনগণের চাপে শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। যেমন লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিলেন ফখরুদ্দীন সরকার, তেমন দেশ পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার পর ইউনূসকে আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের পরামর্শে এবং চাপে নির্বাচন দিতে হয়। ফখরুদ্দীন আহমদ সরকারের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। কিন্তু তাঁদের দুই বছরের শাসনকালে বাংলাদেশ অন্তত ১০ বছর পিছিয়ে গেছে। এঁদের অসম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র আবার জাগরিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার আমলে। দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারও দেশ পরিচালনার সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। ইউনূস সরকারও বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছে আরও ২০ বছর।
লক্ষ করলে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরে যাঁরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছিলেন, তাঁরা সবাই এক-এগারোরও কুশীলব ছিলেন। নির্বাচন নয়, আগে সংস্কার; জনগণ চায় আমরা আরও ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকি; শুধু নির্বাচন দেওয়ার জন্য আমরা ক্ষমতায় বসিনি-এ কথাগুলো যাঁরা দেড় বছর বলেছেন, তাঁরা সবাই এক-এগারোর সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। এক-এগারোর লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাঁরা এবারও চেষ্টা করেছিলেন। এঁরা যদি আইনের আওতায় না আসেন তাহলে আবার গণতন্ত্রকে বিপদাপন্ন করার ষড়যন্ত্র করবেন। এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার নিরাপদ নয়।