গতকালের ওই দুর্ঘটনায় প্রাইভেটকারের চালক পালিয়ে গেলেও অটোরিকশার যাত্রী কাইয়ুম মিয়া (৬০) নিহত হন। গুরুতর আহত অটোচালক বোরহান উদ্দিন এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।
এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়।
গতকাল সার্ভিস রোডে দুর্ঘটনার আগের দিনই মূল এক্সপ্রেসওয়েতে দ্রুতগতির একটি কাভার্ড ভ্যান একটি বাসকে ধাক্কা দেয়। এর আগেও ১০ মার্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ৩০০ ফুট এক্সপ্রেসওয়েতে একটি প্রাইভেটকারে হইহুল্লোড় করতে করতে যাচ্ছেন কয়েকজন যুবক।
আইন অনুযায়ী, এই সড়কে প্রাইভেটকার ও বাসের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার, মোটরসাইকেলের জন্য ৬০ এবং ট্রাকের জন্য ৫০ কিলোমিটার। সার্ভিস রোডে গতি আরও কম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কটিতে পর্যাপ্ত ফুটওভারব্রিজ নেই। যেগুলো আছে, তার বেশির ভাগই অপ্রয়োজনীয় স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে। মস্তুল এলাকায় দায়িত্বে থাকা বিআরটিসির টিকিট বিক্রেতা বলেন, যেখানে বাস থামে, দুই পাশে সংযোগ সড়ক, মানুষ যেখান দিয়ে রাস্তা পার হয়, সেখান থেকে অন্তত ৪০০ মিটার দূরে ফুটওভার ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে। সারা মাসে ১০ জন সেটা দিয়ে পার না। দৌড়ে মূল সড়ক পার হতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।
দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসালেও কার্যকর নজরদারির অভাব স্পষ্ট। স্পিডগান না থাকায় অতিরিক্ত গতির গাড়ি শনাক্ত করা যাচ্ছে না। নিষিদ্ধ হলেও অটোরিকশা চলছে নির্বিঘ্নে, এমনকি উল্টো পথেও। গত ২৯ মার্চ বিকাল ৩টা থেকে ২৪ ঘণ্টার অভিযানে অতিরিক্ত গতি ও অন্যান্য অপরাধে প্রায় ৭০টি মামলা দায়ের করে ট্রাফিক পুলিশ। তবে এতে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি।
অন্যদিকে সন্ধ্যার পর সড়কটির চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। আলোকসজ্জায় ঝলমলে পরিবেশে ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ ঘুরতে আসেন, কেউ ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করেন, আবার অনেকে দলবেঁধে খাবারের উদ্দেশ্যে বের হন। এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন ইন্টারসেকশন ছোটখাটো পার্ক বা আড্ডাস্থলে পরিণত হয়। গভীর রাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সড়কটি তখন রেসিং ট্র্যাকে পরিণত হয়। মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের প্রতিযোগিতামূলক দৌড় চলে। শব্দ শোনা যায় দূরদূরান্ত থেকে।
পুলিশ অফিসার হাউজিং সোসাইটি (পিওএইচএস) সংলগ্ন ইউটার্নে চা বিক্রি করেন ইমরান। তিনি বলেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা দেখি। মূল কারণ উচ্চগতি, অটোরিকশার দখল আর উল্টো পথে চলাচল। রাতের দিকে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়ংকর হয়। অনেক বাইকার স্টান্ট করে, হাত ছেড়ে বাইক চালায়- চোখের সামনে মানুষ পিষ্ট হতে দেখেছি।’
দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরিভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে- অটোরিকশা চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করা বা আলাদা লেন করে দেওয়া, স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা স্থাপন, অতিরিক্ত গতির জন্য কঠোর জরিমানা এবং যানবাহনে স্পিড গভর্নর নিশ্চিত করা। পাশাপাশি যেসব স্থানে মানুষ বেশি পারাপার হয়, সেখানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
মস্তুল এলাকায় দায়িত্বরত খিলক্ষেত থানার উপপরিদর্শক রাজু আহমেদ বলেন, ‘প্রায় সব যানবাহনই গতিসীমা অমান্য করে। অনেকেই ১৩০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালায়। ফলে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে।’ তিনি জানান, উচ্চগতির কারণে অনেক সময় গাড়ি থামানোও সম্ভব হয় না। এদের বড় অংশই দুর্ঘটনা ঘটায়। নিজেরাও বিপদে পড়ে, অন্যদেরও বিপদে ফেলে। তিনি ভাঙা ব্যারিকেড দেখিয়ে বলেন, প্রায়ই উচ্চগতিতে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার এসে গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পুলিশের ব্যারিকেডে ধাক্কা মারে। সপ্তাহে খুব কম দিনই দুর্ঘটনা ছাড়া যায়। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন বলে জানান।
এদিকে সড়কটির ইউটার্নগুলোতে সিগন্যাল লাইট চালু আছে বহুদিন ধরে। তবে তা শুধু নিয়ম রক্ষার্থে। কখনো সিগন্যাল দেখে গাড়ি থামতে দেখা যায়নি।
সব মিলিয়ে, উন্নত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রণহীনতা, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার কারণে ৩০০ ফুট এক্সপ্রেসওয়ে এখন কার্যত একটি ‘ডেথ ট্র্যাক’-এ পরিণত হয়েছে।
সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন