শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০২:২৮ পূর্বাহ্ন

সাত মামলা নিষ্পত্তিসহ আরো সুবিধা আদায়

কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে আশার বীজ বুনেছিল জাতি। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁর ‘জাদুর ছোঁয়ায়’ বিশ্বের দুয়ারে আরো উজ্জ্বল হবে বাংলাদেশের মুখ, বাড়বে মানুষের মর্যাদা, খুলে যাবে দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ সম্ভাবনার দুয়ার।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে মানুষের স্বপ্ন কতটা পূরণ করতে পেরেছেন নোবেলজয়ী? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনুসন্ধানে নামে গণমাধ্যম।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন এক চিত্র।

যাঁর সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশার যোজন যোজন দূরত্ব, ক্ষমতার চেয়ারে বসে গুনে গুনে সাতটি মামলা থেকে মুক্তি দিয়েছেন নিজেকে, যার মধ্যে আলোচিত দুর্নীতি মামলাও রয়েছে। এর পাশাপাশি অস্বাভাবিক দ্রুততায় বাগিয়ে নিয়েছেন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স। সমাধান করে ফেলেছেন সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড নামক ই-ওয়ালেটের লাইসেন্স না পাওয়ার জটিলতারও। এর সবই ঘটে তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের পর।
 

এই প্রতিষ্ঠানগুলো ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে প্রধান উপদেষ্টার শপথ গ্রহণের আগে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরে দাঁড়ালেও দায়িত্ব ছাড়ার পর আবার সেসব প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ফলে ক্ষমতার আলোয় আসার সঙ্গে সঙ্গে এই সুবিধাগুলো নেওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেই মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তাঁদের সঙ্গে যাতে জনগণ, দেশের স্বার্থের সংঘাত না ঘটে সে জন্য শপথ নিতে হয়।

শুধু সরকার না, সরকারি অনেক পদে বসার শর্তই থাকে যে কোনো লাভজনক পদে থাকলে তা ছেড়ে দিতে হবে।

ড. ইউনূসের সুবিধা আদায়ের বিষয়ে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে ছিলেন। সেখানে বসে তিনি তাঁর স্বার্থে যেসব কর্মকাণ্ড করেছেন, সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশ সমালোচনা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। উনি ব্যক্তিগত স্বার্থে এই পদকে (প্রধান উপদেষ্টা) ব্যবহার করেছেন। শুধু তাই না, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে তিনি দায়ী হয়ে গেছেন।

 

এর মধ্য দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনি শপথ ভঙ্গ করেছেন। আর সব কিছু মিলে তিনি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।’

জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স : ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় বসে যেসব সুবিধা নেন, তার মধ্যে একটি হলো জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স পায় গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস লিমিটেড। এরপর মার্চে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সদস্যপদও লাভ করে।

ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির রিক্রুটিং লাইসেন্স (আরএল) নম্বর ২৮০৬। ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, মিরপুর-১ নম্বরের চিড়িয়াখানা সড়কের ৫৩/এ বক্সনগরের টেলিকম ভবন।

জানা গেছে, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেডের ৯০ শতাংশ শেয়ার ইউনূস সেন্টারের, বাকি ১০ শতাংশ শেয়ার গ্রামীণ শিক্ষার। ১৯৯৭ সালে ড. ইউনূস ‘গ্রামীণ শিক্ষা’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রথমদিকে এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণের আগে তিনি সেখান থেকে পদত্যাগ করেন। আর গ্রামীণ শিক্ষার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী নজরুল হক গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেও এমডি পদে দায়িত্বরত।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস লিমিটেড আবেদনটি করেছিল ২০০৯ সালে। লক্ষ্য ছিল, নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থীদের বিদেশে রপ্তানি করা। দীর্ঘ ১৬ বছর পর তাদের কাঙ্ক্ষিত সনদটি দেয় বিএমইটি। পরের মাসে প্রয়োজনীয় ফি ও জামানত জমা দেওয়া হয়। তারপর আসে আরএল নম্বর।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বায়রার একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তখন পর্যন্ত একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড সনদ পায়। অথচ ওই সময় আরো একাধিক প্রতিষ্ঠান এই সনদের অপেক্ষায় ছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, বায়রার সদস্যপদ না থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি করতে পারবে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বায়রার সনদ পাওয়ার আগেও বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির কাজ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সনদ না থাকায় তারা মধ্যস্থতা করত, জনশক্তি রপ্তানির কাজটি করা হতো অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

প্রতিষ্ঠানের এমডি কাজী নজরুল হক এ তথ্য স্বীকার করে বলেন, আমাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও বহু বছর ধরে আমরা সরাসরি নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠাতে পারিনি। এবার সনদ পাওয়ার পর প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রশিক্ষণে কমপক্ষে এক বছর লাগে।

তিনি আরো বলেন, আমরা আগে লাইসেন্স (সনদ) পেতে  আবেদন করেছিলাম। বারবার চেষ্টার পরও বহু বছর অনুমোদন দেওয়া হয়নি। আবার সেই আবেদনের রেফারেন্স দিয়ে আবেদন করেছিলাম। আবেদন করার পর শেষমেশ সনদ পেয়েছি। আমরা এখনো জাপানে লোক পাঠাইনি। পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এমডি জানান, জাপান অটোমেটিক স্কুল নামে তাঁদের একটি প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে অটোমেকানিক ও জাপানি ল্যাংগুয়েজ শেখানো হয়। জাপানের সঙ্গে এরই মধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠানের একটি চুক্তি হয়েছে। প্রশিক্ষিত একটি ব্যাচকে শিগগিরই দক্ষ কর্মী হিসেবে জাপানে পাঠানো সম্ভব বলেও জানান তিনি।

অনুসন্ধান বলছে, গ্রামীণের এই প্রতিষ্ঠানের জনশক্তি রপ্তানির প্রক্রিয়ায় গতি পায় ড. ইউনূসের সরকারি সফরে জাপানে যাওয়ার পর। গত বছর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের জাপান সফরকালে দেশটির নিয়োগকারীদের সঙ্গে ৪০টি নতুন চুক্তি সই হয়। গত বছরের মে মাসে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাপান সফর করেন। জাপানের শ্রমবাজারে তাঁর প্রতিষ্ঠান যাতে যুক্ত হতে পারে সে লক্ষ্যে তিনি ছিলেন বেশ উৎসাহী। ওই সফরে দুই দেশের মধ্যে শ্রম অভিবাসনকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে দুটি বড় সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করা হয়েছিল। তাতে পাঁচ বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের সমঝোতা স্মারক সইয়ের সঙ্গে আগেই নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য সব ধরনের সুযোগ উন্মুক্ত করে দেন ড. ইউনূস। গত বছরের জানুয়ারিতে রিক্রুটিং এজেন্সির সনদ পাওয়ার পর মার্চে বায়রার সদস্যপদ লাভ করে। তারপর জাপানে জনশক্তি পাঠানোর জন্যও সরকারি অনুমোদনও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন চলছে তাদের জাপানে জনশক্তি রপ্তানির চূড়ান্ত প্রক্রিয়া।

শপথের আগে খালাস : ৭ আগস্ট ২০২৪। দেশের রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তনের প্রাক্কালে ফ্রান্স থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ঠিক সেই দিনই কাকরাইলে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে চলছিল তাঁর বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলার শুনানি, যে মামলায় এর আগে তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন নিম্ন আদালত। সেদিন দুপুরের মধ্যেই শেষ হয় শুনানি। দণ্ড থেকে খালাস পান ড. ইউনূসসহ সব আসামি।

পরের দিন ৮ আগস্ট সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে নামেন ড. ইউনূস। সেদিন রাতেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে নাটকীয় পরিবর্তনের পর ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বড় বড় মামলা নিষ্পত্তি হতে শুরু করে।

জানা গেছে, ড. ইউনূস ও গ্রামীণ টেলিকমের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে একটি মামলা করেন সরকারি সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক আরিফুজ্জামান। অভিযোগ ছিল, শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল গঠন না করা, তহবিলে নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের না দেওয়া, অর্জিত ছুটির মজুরি নগদায়ন না করা এবং চাকরি স্থায়ী না করা।

এই অভিযোগে শ্রম আইনের একাধিক ধারায় মামলা হয় এবং ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা দেন। রায়ে বলা হয়, আসামিরা শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ৪(৭) (৮), ১১৭, ২৩৪-এর বিধান লঙ্ঘন করে আইনের ৩০৩(৫) ও ৩০৭ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে রায়ের দিনই আপিলের শর্তে তাঁরা এক মাসের জামিন পান। এরপর আপিল করেন শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে। শুরু হয় সময় বাড়ানো, স্থগিতাদেশ এবং শুনানির ধারাবাহিকতা।
শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০২৪ সালের ১ আগস্ট উভয় পক্ষ যৌথভাবে শুনানি এগিয়ে আনার আবেদন করে। এতে যুক্তি দেওয়া হয়, শ্রম আইন অনুসারে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ রয়েছে। শ্রম আইনে নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি হয়নি।

এই আবেদন গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগের দিন ৭ আগস্ট আপিল নিষ্পত্তি করে রায় দেন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল।

এই শুনানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল, বাদীপক্ষের কোনো আইনজীবী সেদিন উপস্থিত ছিলেন না। আসামিদের পক্ষে সুপিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন আপিল শুনানি করলেও এদিন বাদীপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। যদিও এর আগে অধিদপ্তরের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান ও সৈয়দ হায়দার আলী শুনানি করে আসছিলেন।

পরে একে একে উধাও আরো যত মামলা : শেখ হাসিনার শাসনামলে ড. ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অন্তত দেড় শ থেকে দুই শটি মামলা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন গ্রামীণ গ্রুপের আইন উপদেষ্টা সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন। তাঁর ভাষ্য, ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অধিকাংশ মামলা কর ফাঁকি, শ্রম আইন লঙ্ঘন, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে। সরকার পতনের আগে মাত্র একটির বিচার সম্পন্ন হয়েছিল, যেটিতে ছয় মাসের কারাদণ্ডের সাজা পেয়েছিলেন ড. ইউনূস। অধিকাংশ মামলা বিচারাধীন ছিল।

গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর উচ্চ আদালতে অন্তত সাতটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ ছয় হাজার ৭৮০ টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে দুদকের মামলা। ২০২৩ সালের ৩০ মে ড. ইউনূসসহ ১৪ জনকে আসামি করে এই মামলা করা হয়।

এজাহারে অভিযোগ ছিল, বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত ও ব্যাংক হিসাব খোলার তারিখে অসংগতি, ‘ভুয়া’ সেটেলমেন্ট চুক্তি এবং কর্মীদের প্রাপ্য অর্থ না দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও আইনজীবীদের হিসাবে কোটি কোটি টাকা স্থানান্তর।

দুদকের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, অ্যাডভোকেট ফি হিসেবে প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তরিত হয়েছিল মাত্র এক কোটি টাকা। বাকি ২৫ কোটির বেশি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই মামলায় দণ্ডবিধি ও মানি লন্ডারিং আইনের একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

হাইকোর্ট এক বছরের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশও দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট ইউনূস শপথ গ্রহণ করেন। আর তিন দিনের মাথায় ১১ আগস্ট দুদকের পক্ষ থেকেই মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগে শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল হাইকোর্টের আগের আদেশ বাতিল করে দেওয়া হয়। এর ফলে মামলাটির আইনি অস্তিত্বও শেষ হয়ে যায়। এই ঘটনার পর ইউনূসের আরো ছয়টি মামলা বাতিল করেন হাইকোর্ট। ২০২৪ সালের ২৪ অক্টোবর এক দিনেই পৃথক রায়ে এসব মামলা বাতিল করা হয়, যা পরে আপিল বিভাগও বহাল রাখেন।

এই মামলাগুলোর একটি ছিল ২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারির, যেখানে রাজনৈতিক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে মামলা হয়েছিল। চার বছর পর আদালতে হাজির হয়ে মুচলেকা দিয়ে জামিন নেন ড. ইউনূস। পরে ২০১১ সালে এই মামলা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি। ওই সময় হাইকোর্ট মামলা বাতিল প্রশ্নে রুল জারি করেছিলেন।

বাকি পাঁচটি ছিল গ্রামীণ কমিউনিকেশন্সের চাকরিচ্যুত কর্মচারীদের করা মামলা। অবৈধভাবে চাকরিচ্যুতির অভিযোগ এনে প্রথমে ২০১৯ সালের ৩ জুলাই ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে ইউনূসসহ গ্রামীণ কমিউনিকেশনের তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন আব্দুস সালাম, শাহ আলম ও এমরানুল হক।

ওই বছর হোসাইন আহমেদ ও আব্দুল গফুরও একই অভিযোগে আরো দুটি মামলা করেন। এসব মামলা বাতিল চেয়ে ২০২০ সালে হাইকোর্টে আবেদন করেন ড. ইউনূসসহ তিনজন। তখন হাইকোর্ট মামলা বাতিল প্রশ্নে রুল জারি করেন। পৃথক শুনানি শেষে গত বছর ২৪ অক্টোবর হাইকোর্ট রায় দেন। এসব মামলার বেশির ভাগই বছরের পর বছর বিচারাধীন ছিল। শেষ পর্যন্ত একযোগে শুনানি শেষে সবগুলোই বাতিল হয়ে যায়।

ই-ওয়ালেট ‘সমাধান’ জটিলতার তড়িঘড়ি সমাধান : অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিজিটাল পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেড’কে বিশেষ অগ্রাধিকারে লাইসেন্স দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে ই-ওয়ালেট প্রযুক্তি সেবা দিতে পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডরের (পিএসপি) লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ফাইল ঝুলে থাকার পর এই জটিলতার অবসান ঘটে ড. ইউনূস ক্ষমতায় বসার পর।

জানা গেছে, গত বছরের ২ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট (পিএসডি) এসংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (পিএসডি) রাফেজা আক্তার কান্তা স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়, পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন, ২০২৪-এর ধারা ৫(৪)-এর ক্ষমতাবলে দেশে ইলেকট্রনিকস লেনদেন প্রসারের লক্ষ্যে সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেডকে ২০২৫ সালের ২ জুন থেকে পিএসডি ও এডিসিঅ্যান্ডএল (সমাধান) শর্তসাপেক্ষে দেশের অভ্যন্তরে পরিশোধ সেবাদানকারী হিসেবে লাইসেন্স প্রদান করা হলো।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর ডিজিটাল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিস (পিএসপি) হিসেবে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন আব্দুর রউফ তালুকদার। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও অনুমোদন পায়নি আবেদনটি।

তথ্য বলছে, ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন ওই বছরের ৮ আগস্ট। এর মাত্র ৫১ দিনের মাথায়, ২৯ সেপ্টেম্বর অনাপত্তিপত্র পেয়ে যায় সমাধান সার্ভিসেস। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তখন ১৩টি শর্ত দিয়ে এক বছরের মধ্যে পূর্ণ প্রস্তুতির নির্দেশ দেয়। তবে এর জন্য তাদের এক বছর দরকার হয়নি, মাত্র ৯ মাসেই সব শর্ত পূরণ হয়েছে দাবি করে ২০২৫ সালের ২ জুন চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়ে যায়। একই বছরের ৪ ডিসেম্বর শুরু করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম।

শর্তগুলোর মধ্যে ছিল—২০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন, শক্তিশালী আইসিটি অবকাঠামো, এমএমএল বা বিএফটি নীতিমালা, গ্রাহক যাচাই, ডাটা সুরক্ষা, এসকিউএ ও ভিএপিটি টেস্টিং, এমনকি ডিজাস্টার রিকভারি পরিকল্পনা ইত্যাদি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফে শর্তগুলো পূরণ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

শর্তের তালিকায় কোনো ছাড় না থাকলেও লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে তিন বছর অপেক্ষা করেও অনুমোদন না পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি রাতারাতি এত অগ্রাধিকারে এলো কার ইশারায়, এ নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। ৯ সদস্যের বোর্ডে অধিকাংশই গ্রামীণ টেলিকম-ঘনিষ্ঠ। চেয়ারম্যান এম শাহজাহান, যিনি গ্রামীণ ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক; আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান, যিনি গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়ার আগে তাদের যোগ্যতা, উৎপাদনশীলতা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে কি না তা যাচাই-বাছাই করা আবশ্যক। তা না হলে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকের মতো অবস্থা হবে। ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো এখন উচ্চ খেলাপি ঋণের বোঝা বহন করছে। ওই ব্যাংকগুলোতে যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল না। তবে লাইসেন্স পাওয়ার সব শর্ত পূরণের পাশাপাশি দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলে যে কেউই বাজারে আসতে পারে।
তিনি মনে করেন, অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রকৃত যোগ্যতা যাচাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব থাকলে প্রতিষ্ঠান টেকসই হয় না।

গ্রামীণ ব্যাংকে মালিকানা কমায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ সীমিত : দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং কাঠামোর বাইরে পরিচালিত হওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সরকারের মালিকানা ও কর্তৃত্ব কমানোর সিদ্ধান্তের পর এই বিতর্ক আরো জোরালো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের মালিকানা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা হয়েছে। সরকারের অংশীদারি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদে সরকার মনোনীত পরিচালকের সংখ্যা এবং প্রভাবও কমেছে। এতে ব্যাংকটির ওপর সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং এর পেছনে নীতিগত যুক্তিই বা কি। একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহমুদুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘একই দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মতো বিশেষায়িত ব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জবাবদিহি করে। তাহলে গ্রামীণ ব্যাংক কেন সেই কাঠামোর বাইরে থাকবে? যদি গ্রামীণ ব্যাংক এনজিও হয়ে থাকে তাহলে সে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) কাছে জবাবদিহি করবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যেন নিজেই নিজের মতো চলছে।’

তিনি আরো বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক যদিও গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তবুও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রক সংস্থা না থাকা জনস্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে। এ বিষয়ে আইনি পর্যালোচনা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।

এদিকে ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গ্রামীণ ব্যাংক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নীতিগত সুবিধা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সেবা সংস্থা হিসেবে বিবেচনা করে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল তৎকালীন উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান জানান, ফিন্যানশিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট ২০১৫ অনুসারে গ্রামীণ ব্যাংককে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনার একটি বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই ব্যাংকের সুবিধাভোগী, তাঁদের মধ্য থেকে ৯ জন নির্বাচিত হয়ে আসবেন। ব্যাংকের বোর্ডে সদস্যদের মধ্য থেকে ৯ জন নির্বাচিত হন এবং তাঁদের মধ্য থেকেই চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ায় বোর্ড গঠনে সরকারি প্রভাব হ্রাস পেয়েছে, যা একদিকে অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করলেও অন্যদিকে জবাবদিহি ও তদারকির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ



Our Like Page