মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ০২:১৯ পূর্বাহ্ন

শাহজালালে ফ্লাইট বিপর্যয়, এক মাসে ৮৫৮ ফ্লাইট বাতিল

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নিরাপত্তা সংকট, আকাশসীমা বন্ধ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত এক মাসে বড় ধরনের ফ্লাইট বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যগামী ও মধ্যপ্রাচ্যফেরত মোট ৮৫৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

তবে একই সময়ে সীমিত পরিসরে মোট ১ হাজার ১৯০টি ফ্লাইট পরিচালিত বা পরিকল্পিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

রোববার (২৯ মার্চ) রাতে বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান- এই কয়েকটি দেশের আকাশসীমা আংশিক বা পূর্ণভাবে বন্ধ থাকা এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে

এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া প্রবাসী কর্মী, ট্রানজিট যাত্রী এবং পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীদের ওপর। 

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি জটিল হলেও ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত-গামী কিছু ফ্লাইট ধাপে ধাপে চালু রাখা হয়। বিশেষ করে মার্চের মাঝামাঝি থেকে কিছু রুটে ফ্লাইট চলাচল বাড়তে থাকে।

তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি পরিচালিত হয় ৬টি ফ্লাইট, ১ মার্চ ২০টি, ২ মার্চ ১৮টি, ৩ মার্চ ২২টি, ৪ মার্চ ৩৫টি, ৫ মার্চ ৩৮টি, ৬ মার্চ ৩৪টি, ৭ মার্চ ৩৯টি, ৮ মার্চ ৩১টি, ৯ মার্চ ৪০টি, ১০ মার্চ ৪২টি, ১১ মার্চ ৩৬টি, ১২ মার্চ ৪৮টি, ১৩ মার্চ ৩৭টি, ১৪ মার্চ ৪৪টি, ১৫ মার্চ ৪৯টি, ১৬ মার্চ ৪০টি, ১৭ মার্চ ৪৫টি, ১৮ মার্চ ৪৫টি, ১৯ মার্চ ৪৫টি, ২০ মার্চ ৩৬টি, ২১ মার্চ ৩৭টি, ২২ মার্চ ৩৮টি, ২৩ মার্চ ৪৫টি, ২৪ মার্চ ৫০টি, ২৫ মার্চ ৪৫টি, ২৬ মার্চ ৫০টি, ২৭ মার্চ ৪৩টি, ২৮ মার্চ ৩৭টি, ২৯ মার্চ ৪৫টি এবং ৩০ মার্চ (পরিকল্পিত) রয়েছে ৫০টি ফ্লাইট।

 

এই সময়ে পরিচালিত ফ্লাইটগুলোর বড় অংশ ছিল ওমানের মাস্কাট, সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্য এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ-গামী।

সবচেয়ে বেশি ফ্লাইট গেছে সৌদি আরব ও আমিরাতে

বিমানবন্দর সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মার্চজুড়ে পরিচালিত ফ্লাইটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল সৌদি আরবগামী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ফ্লাইট।
বিশেষ করে ২৪, ২৬ ও ৩০ মার্চ- এই তিন দিনে প্রতিদিন ৫০টি করে ফ্লাইট পরিচালিত বা পরিকল্পিত হয়েছে, যা পুরো সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এছাড়া মার্চের দ্বিতীয়ার্ধে দুবাইগামী ফ্লাইটের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি পর্যন্ত দুবাইগামী ফ্লাইট পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। 

যে কারণে বাতিল হলো শত শত ফ্লাইট

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল হওয়ায় অনেক এয়ারলাইন্স তাদের ফ্লাইট অপারেশন স্থগিত, পুনঃনির্ধারণ বা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ করে যেসব রুটে ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান ও ইউএইর আকাশসীমা ব্যবহার করতে হয়, সেসব রুটে শিডিউল বিপর্যয় বেশি হয়েছে।

ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, যেদিন ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়। এরপর ১ মার্চ ৪০টি, ২ মার্চ ৪৬টি, ৩ মার্চ ৩৯টি, ৪ মার্চ ৩২টি, ৫ মার্চ ৩৬টি, ৬ মার্চ ৩৪টি, ৭ মার্চ ২৮টি, ৮ মার্চ ২৮টি, ৯ মার্চ ৩৩টি, ১০ মার্চ ৩২টি, ১১ মার্চ ২৭টি, ১২ মার্চ ২৮টি, ১৩ মার্চ ২৫টি, ১৪ মার্চ ২৬টি, ১৫ মার্চ ২৩টি, ১৬ মার্চ ৩১টি, ১৭ মার্চ ৩১টি, ১৮ মার্চ ২৬টি, ১৯ মার্চ ২৬টি, ২০ মার্চ ২৮টি, ২১ মার্চ ২৫টি, ২২ মার্চ ২০টি, ২৩ মার্চ ২০টি, ২৪ মার্চ ২০টি, ২৫ মার্চ ২০টি, ২৬ মার্চ ২২টি, ২৭ মার্চ ২২টি, ২৮ মার্চ ২১টি এবং ২৯ মার্চ ২২টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।

সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট বাতিল হয়েছে ৮৫৮টি ফ্লাইট। 

৩০ মার্চও বাতিল থাকছে ১৮টি ফ্লাইট

বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, সোমবার (৩০ মার্চ) কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের মোট ১৮টি ফ্লাইট বাতিল রয়েছে। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে- কুয়েত এয়ারওয়েজ- ২টি, এয়ার অ্যারাবিয়া, শারজাহ- ৪টি, গালফ এয়ার, বাহরাইন- ২টি, কাতার এয়ারওয়েজ- ৪টি, এমিরেটস ও ইউএই- ২টি, জাজিরা এয়ারওয়েজ, কুয়েত- ৪টি।

চাপে প্রবাসী যাত্রী

ফ্লাইট বাতিল ও শিডিউল পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রবাসী কর্মীদের ওপর। বিশেষ করে ঈদ-পরবর্তী সময়ে বহু যাত্রী কর্মস্থলে ফিরতে গিয়ে বাতিল, বিলম্ব ও পুনঃনির্ধারিত ফ্লাইটের কারণে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে যাত্রীরা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিমানবন্দরে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন, অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট বাতিল বা সময় পরিবর্তনের কারণে মানসিক চাপ, অতিরিক্ত ব্যয় ও ভোগান্তি বাড়ছে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নজরদারি জোরদার

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় ফ্লাইট অপারেশন, যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও এয়ারলাইন্স সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। যাত্রীদের সর্বশেষ ফ্লাইট আপডেট জেনে বিমানবন্দরে আসারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফ্লাইট অপারেশনও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।



Our Like Page