মুক্তিযোদ্ধাদের শুদ্ধ তালিকা

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত তালিকা তৈরি বা হালনাগাদকরণের প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেওয়া আদৌ কোনো ফল দেবে কি? তালিকা তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম দেখা দেওয়ার আশঙ্কা জোরালো হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে সরকার আকস্মিকভাবে স্থগিত করে দিলেও তা বাতিল করা হয়নি। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে দুর্নীতি ঠেকাতে অপারগ হওয়ার কারণে একটি শুদ্ধ তালিকা করার কাজ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করতে হয়েছে। হাহুতাশ বা আক্ষেপ না করে বরং যথাসম্ভব দ্রুত সঠিক পন্থা উদ্ভাবন করে এতকাল যাঁরা এই তালিকা প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাঁদের বিযুক্ত করা দরকার। এ নিয়ে আর সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে, জনপ্রশাসনের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে এতকাল যেভাবে এই তালিকার হালনাগাদকরণ বা শুদ্ধকরণের প্রক্রিয়া চলমান ছিল, সেই ধারা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে হবে।

একটি নির্ভুল ও প্রকৃত তালিকা তৈরির পূর্বশর্ত হলো সব ধরনের সংকীর্ণ ও কোটারি মনোভাব পরিহার করা। অপ্রিয় হলেও সত্য, জাতিগতভাবে আমরা একটা অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে কঠিন এক সময় অতিক্রম করছি। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায়, মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তৈরি করতে দুর্নীতিমুক্ত থাকা

সম্ভব হচ্ছে না এবং শুধু এই কারণে তা বন্ধ রাখার ঘটনা জাতীয় লজ্জা ছাড়া কিছু নয়। বিষয়টি এমন নয় যে, এই তালিকা অসম্পূর্ণ বা শুদ্ধ না করে যেভাবে আছে, সেভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেলে রাখা হবে। নির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর ওপর দায় না চাপিয়ে আমাদের সম্ভবত একটি আত্মজিজ্ঞাসারও দরকার।

এর আগে আমরা বিদেশি বন্ধুদের দেওয়া স্বর্ণপদকে ভেজাল দেওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। এবং তা প্রকাশিত হওয়ার পর অভিযুক্তদের বিষয়ে দেশজুড়ে ধিক্কার উঠলেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এবার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলে দেড় লাখ নতুন দরখাস্ত জমা পড়া একটি অভাবনীয় ঘটনা। ‘একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা’ নামে একটি সংগঠন দাবি করেছিল, মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে দেওয়ার নামে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। তাদের মতে, ‘প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দেড় লাখ হবে। ইতিমধ্যে সোয়া দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে।’ সরকার ধারণা করেছিল বাদ পড়া মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৫ হাজার হতে পারে, কিন্তু ‘আগ্রহীর’ সংখ্যা দেড় লাখে দাঁড়িয়ে যায়। প্রথম আলোর ১২ মার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী, গড়ে প্রতি ছয়টি দরখাস্তের মধ্যে পাঁচটিই অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে সবাই হয়তো জেনেশুনে অসাধু পন্থা অবলম্বন করেননি। জেলা-উপজেলা থেকে আসা দরখাস্তগুলো ভুলে ভরা, এর মুখ্য কারণ তাদের কাছে মুক্তিযোদ্ধার উপযুক্ত সংজ্ঞাই পরিষ্কার ছিল না।

এই ব্যর্থতার দায় অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলকে নিতে হবে।তাদের স্বীকার করতে হবে যে, অনিয়ম থেকে মুক্ত থেকে জাতির জন্য এই গৌরবজনক কাজটি সম্পন্ন করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় সুউচ্চ নীতি–নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচারের বোধ জাগ্রত করতে না পারলে একটি শুদ্ধ ও সম্পূর্ণ তালিকা তৈরি হবে না। সব রকম দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করতে হবে। এটা খুবই হতাশাজনক যে বিভিন্ন সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা দফায় দফায় তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলেও একটি সঠিক ও গ্রহণযোগ্য তালিকা এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এর জন্য আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে?

৪৭ বছর আগে যার যেমন অবস্থান ছিল, সেটা বিবেচনায় রেখেই দলিল ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কে মুক্তিযোদ্ধা, কে মুক্তিযোদ্ধা নয়, তা নির্ধারণ করতে হবে। আমরা মনে করি, আমলানির্ভর প্রথাগত কমিটি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্ভুল তালিকা তৈরি করা যাবে না। অতএব, নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠনের মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes