নদী খননে ৬০০০ কোটি টাকার প্রকল্প

পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এশিয়া মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘতম নদ পরাতন ব্রহ্মপুত্র খননে মহাপরিকল্পণা নিয়েছে বর্তমান সরকার। এক সময়ের খরস্রোতা ব্রহ্মপুত্র আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।

বাংলাদেশ অম্ভ্যন্তরীন নৌ পরিবহর কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) দেশের ৭টি নদী খননে ৫ হাজার নয় শত কোটি টাকার ডিপিপি ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে। ২৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রহ্মপূত্র নদের মধ্যে দেওয়ানগঞ্জের চিকাজানী ইউনিয়নের খোলাবাড়ির চর থেকে টোক পর্যন্ত ২২৭ কিলোমিটার ব্রহ্মপূত্র নদ খননে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প। বিআইডব্লিউটিএ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপূত্র তলদেশে কমপক্ষে ৩০০ ফুট প্রশস্ত এবং শুকনো মৌসুমে কমপক্ষে ১২ ফুট পানির গভীরতা বিদ্যমান রেখে খনন কাজ সম্পন্ন করা হবে। খনন সম্পন্ন হলে কলকাতা সমুদ্র বন্দর থেকে পণ্যবাহী ভ্যাসেল জাহাজ কুড়িগ্রামের চিলমারী দিয়ে ব্রহ্মপূত্রে প্রবেশ করে বাংলাদেশের ব্রহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ নৌ বন্দরে এসে পৌছবে। এতে পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই বহুলাংশে সাশ্রয় হবে।

ব্রহ্মপূত্র খনন হলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যাবে, মিঠা পানিতে দেশীয় নানা প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়বে, আশপাশে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে, নদের পাশে বন্যার হাত থেকে রক্ষা, পরিবেশ রক্ষাসহ এই নদ থেকে নানা সুফল পাবেন ময়মনসিংহ ও কুড়িগ্রাম ও কিশোগঞ্জ জেলার কোটি কোটি মানুষ। এছাড়াও উত্তর পূর্ব ভারতের সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশ গুলোতে খুব সহজে এবং কম খরচে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সুবিধা হবে।

ময়মনসিংহ বিভাগসহ অত্র অঞ্চলের নাগরিকদের দীর্ঘদিনের দাবী ছিলো ব্রহ্মপূত্র নদ খননের। আগামী ১২ এপ্রিল ময়মনসিংহ সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রহ্মপূত্র খনন কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবে বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার জি. এম সালেহ উদ্দিন।

বাংলাদেশ অম্ভ্যন্তরীন নৌ পরিবহর কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ সাইদুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিপ্রায় অনুসারে ব্রহ্মপূত্র, ধরলা, দুধকুমার, পুনরভরা, সোয়াতোলাই, বুড়িশ্বর ও পায়রাসহ দেশের ৭টি নদী ক্যাপিটাল ডেইজিং এর মাধ্যমে খনন কাজে পাঁচ হাজার নয়শত কোটি টাকার ডিপিপি ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে।

তন্মধ্যে শুধু ব্রহ্মপূত্র নদের দেওয়ানগঞ্জের চিকাজানী ইউনিয়নের খোলাবাড়ির চর যমুনার উৎসমূখ থেকে গফরগাও উপজেলার সীামন্ত টোক পর্যন্ত ২২৭ কিলোমিটার খননে তিন হাজার তিনশত কোটি টাকার ব্যয় ধরা হয়েছে। এ ছাড়াও ব্রহ্মপূত্র নদেও উৎসমূখে ঝিনজিরাম নদীও কিছু অংশ ড্রেইজিং করা হবে। এই প্রকল্পটি প্রিএকনেক সভায় অনুমোদন পাওয়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই পরিকল্পণা কমিশনে রয়েছে। এরপর তা একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পর দরপত্রের মাধ্যে ঠিকাদারকে কাজ দেয়া হবে।

নৌ-পরিবহন সচিব মোঃ আব্দুস সামাদ গত ১৬ মার্চ যমুনার তীরে দেওয়ানগঞ্জের চিকাজানী ইউনিয়নের খোলাবাড়ির চর ব্রহ্মপূত্র নদের উৎমূখের বিশাল চর পরিদর্শন করেন। ব্রহ্মপূত্র নদের উৎমূখে ৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় ১০ ফুট উচ্চতার চর জেগে ব্রহ্মপূত্র প্রায় পানিশূণ্য হয়ে পড়েছে। এসময় জামালপুর জেলা প্রশাসক কবির আহমেদ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড, জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী নব কুমার চৌধুরী এবং বিআইডবিøউটিএ কর্মকর্তাগণ সচিবের সঙ্গে ছিলেন।

বিআইডব্লিউটিএ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ সাইদুল ইসলাম আরো জানান, ব্রহ্মপূত্র নদটি ক্লাস ওয়ান হিসেবে ক্যাপিটাল ডেইজিং করা হবে। নদের তীরে বিভিন্ন ল্যান্ডিং ষ্টেশন, পণ্য ও যাত্রী উঠানামার জন্য সিঁড়ি, ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় বাধ নির্মাণসহ আরো অন্যান্য কাজ অন্তভূক্ত রয়েছে।

ব্রহ্মপূত্র নদ খননের পদক্ষেপ নেয়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সুযোগ্য কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি এ অঞ্চলের নাগরিকদের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান খান জানান, এক কালের খর¯্রতো প্রমত্তা ব্রহ্মপূত্র নদ ঘিরে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রবাহমান ছিলো। কিন্তু উৎমূখে চর পড়ায়, নদে কোটি কোটি টন পলি ও বালু জমে চর সৃষ্টি হওয়ায় ব্রহ্মপূত্র এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। জেলা নাগরিক আন্দোলন ব্রহ্মপূত্র নদ খননে বহুবার প্রধানমন্ত্রী বরাবওে স্মারকলিপি, মানববন্ধন, নৌ র‌্যালী, শোভাযাত্রা, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচী পালন করা হয়েছে।

এছাড়াও আরেকটি প্রকল্পে পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে টোক থেকে ভৈরব পর্যন্ত পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ক্যাপিটাল ড্রেজিং কাজ শুরু হয়েছে।

১৭৮৭ সালে ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের স্রোত দিক পরিবর্তিত হয়ে যমুনা নদী হয়। উৎপত্তিস্থল থেকে এর দৈর্ঘ্য ২৮৫০ কিলোমিটার। ব্রহ্মপুত্র নদের সর্বাধিক প্রস্থ ১,০৪২৬ মিটার (বাহাদুরাবাদ)। এটিই বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। ব্রহ্মপুত্রের প্রধান শাখা হচ্ছে যমুনা। এক কালের প্রশস্ত ব্রহ্মপুত্র নদ বর্তমানে শীর্ণকায়।

ব্রহ্মপুত্র নদ খনন করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন একটি নদীপথ তৈরির জন্য উচ্চভিলাষী এক প্রকল্প হাতে নিয়েছে দু’দেশ। দু’দেশের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তিও হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ভারত সরকার ব্রহ্মপুত্রে তাদের অংশে নদী খনন করবে এবং বাংলাদেশ সরকার তাদের অংশে খনন করবে। চলতি বছরে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে। নতুন এ নদীপথের মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মানুষের জন্য যোগাযোগ ও চলাচলের পথও সুগম হবে।

এ নৌপথসহ বিভিন্ন মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সংযোগ বাড়ানোকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছে ভারত। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২ হাজার ৯৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমা এবং ১ হাজার ১১৬ কিলোমিটার নৌসীমা রয়েছে। দু’দেশের মধ্যে ব্রহ্মপুত্রসহ ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নৌপথগুলো ১৯৭২ সাল থেকে কার্যকর রয়েছে এবং দু’দেশের মধ্যকার ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্র্যানজিট অ্যান্ড ট্রেড প্রটোকলটি নবায়ন হয়ে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes