Breaking News

খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং-এ অশনি সংকেত

ড. মিহির কুমার রায় 
খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বাংলাদেশে নূতন কিছু নয় কিন্তু বর্তমানে এর ব্যাপ্তি ও প্রসার এত হয়েছে যে পত্রিকার পাতার দিকে তাকালেই এই খরবটি এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের বছর এটি এবং এই প্রান্তিকে এসে বোঝা যাচ্ছে বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থমন্ত্রী এই ঋণ অব্যবস্থাপনার দায়-দায়িত্ব সরাসরি অস্বীকার না করলেও তিনি এর জন্য সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বরাদ্দকে খেলাপির অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রায়শই শুনা যাচ্ছে এই সব ঋণখেলাপিদের অনেকেই তাদের ঋণের টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে কিংবা টাকা নিয়ে তারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০৯-এ বর্তমান সরকারের ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রাক্কালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা যা ৯ বছর পর এসে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা যার অর্থ দাড়ায় দুই মেয়াদে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ গুণের বেশি। আবার এর বাইরেও ৪৫ হাজার কোটি টাকা কুঋণ অবলোপন (Schedule)করা হয়েছে যার ফলে সর্বসাকুল্যে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি যা মোট বিনিয়োগকৃত টাকার ১০ শতাংশেরও বেশি যাকে অনেকে বলেছেন মহাবিপদসংকেত কিংবা অশনিসংকেত। এরি মধ্যে অনেক গণমাধ্যম ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম কিংবা জালিয়াতির ১৬টি ক্ষেত্র শনাক্ত করেছেন যার মধ্যে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ফারমার্স ব্যাংকের ছয়টি শাখায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম, ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ ব্যবস্থাপনা পরিচালনা অপসারণ, জলবায়ু ফান্ডের ৫০০ কোটি টাকা আটকে যাওয়া ইত্যাদি। যার ফলে তারল্য সংকট ও গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে অপারগতা ইত্যাদি সারা ব্যাংকিং সেক্টরকে একটি ইমেজ সংকটে ফেলেছে। এখন শুনা যাচ্ছে বড় আমানতকারীরা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তাদের অর্থ সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

এই ধরনের একটি পরিস্থিতিতে নূতন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়ার প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক অব্যাহত রয়েছে। যেমন বর্তমানে ব্যাংকের সংখ্যা ৫৭টি এবং আরও ১০টি ব্যাংক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাওয়া না চাওয়ার কোন ধরনের মূল্য সরকারের কাছে আছে বলে মনে হয় না। তা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকাটা কি বিশেষত: রাজনৈতিক বলয়ে আবর্তিতে সার্বিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে? কিংবা বাংলাদেশ ক্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছে তার অনুশীলন কি বাস্তবে হচ্ছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর তার কাজের জন্য কার কাছে দায়বদ্ধ : অর্থমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় নাকি জাতীয় সংসদ সচিবালয়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সরাসরি পাওয়া খুবি দুষ্কর কিংবা এগুলোর কোন উত্তর নেই। আপাতত: দৃষ্টিতে মনে হয় সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন ধরনের

নিয়ন্ত্রণ নেই যা সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। সেখানেই মূল সমস্যা যদিও অর্থমন্ত্রী যে কথা বলছেন যা সরকারের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে সাংঘার্ষিক এবং এই কথাগুলো আর পাঁচ বছর আগে বলতেই বা অসুবিধে কি ছিল? সে যাই হউক না কেন সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পরিচালিত ব্যাংকগুলোতে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সদা ব্যস্ত যার প্রমাণ হলো সরকারের গত অর্থ বছরের জুন মাসে পুঁজি পুনঃকরণ (Recapitalisation) ঘোষণা যদিও তার আগের মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে সরকার ১৪ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা ব্যাংকগুলোকে দিয়েছে যাতে উপকৃত হয়েছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরাই। এখন আবার তারাই চাচ্ছে পুনঃপুঁজিকরণ অর্থ যার পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার মতো যা কোন যৌক্তিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। এখন এই সব খেলাপি ঋণ আদায়ের কি কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে বা হবে তা নিয়ে বিভিন্ন টকশোতে জোড়ালো আলোচনা চলছে যার কিছু কিছু দৃষ্টান্ত অনুকরণীয় হতে পারে। যেমন টেলিভিশনের ডিবিসি চ্যানেলে নবনীতা চৌধুরীর সঞ্চালনায় এই ধরনের একটি অনুষ্ঠানে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের সাফল্য হিসেবে দেখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত উক্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেছেন বর্তমান সময়ে এই ব্যাংকটির ৮০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় হয়েছে এক অভিনব কায়দায় যার মধ্যে প্রচার ও নৈতিকভাবে প্রভাব ঘটানোর বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশিষ্টজন বলছেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি কিংবা সদস্য নিয়োগের আগে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে যোগ্যতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিত অথচ অর্থমন্ত্রী বলেছেন উচ্চ শিক্ষিত যোগ্য ব্যক্তিকে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান দেয়া হয়েছিল যিনি ব্যাংকটিকে ভালো অবস্থায় রেখে যাননি।

আবার একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বিগত ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে একজন সিনিয়র সচিবকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয়ার দু’দিন পর তাকে বদলি করে এবি ব্যাংকের একজন মহিলা পরিচালককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তির সাপেক্ষে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেন যা ব্যাংকিং জগতে এক বিরল ঘটনা বলে আজ্ঞায়িত করেন। এই ধরনের নাটকীয় পরিবর্তন জাতিকে ভাবায় এবং ভাবতে শেখায় এত তড়িৎ সিদ্ধান্তের পরিবর্তন কেন হয়? এই ধরনের একটি পরিবেশে ঋণখেলাপি খাতে আর না হয় সে দিকে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্যদকে আরও যৌক্তিক হতে হবে। এরি মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি এই বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন এবং তাদের কাছে শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপির তালিকাও জমা দেয়া হয়েছে। ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বলছেন খেলাপি কয়েক ধরনের রয়েছে যেমন ব্যবসার টাকা সঠিক কাজে বিনিয়োগ না করা, ব্যবসায় লোকসান দেয়া, টাকা নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো। এর ফলে চাপ পড়ছে ভালো বিনিয়োগকারী/সাধারণ গ্রাহকদের উপর, বাড়ছে সুদের হার ও ব্যবসা পরিচালনা খরচ। এ ব্যাপারে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি খেলাপি ঋণ কমিয়ে

 

আনা এবং ঋণ আদায়ে আইনের দুর্বলতা আছে কি-না তা খতিয়ে দেখছেন। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও উচ্চ আদালতের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার চিন্তা করছে সংসদীয় কমিটি। আবার কেউ কেউ বলছে খেলাপি গ্রাহকদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করতে হবে এবং তাদের সম্পত্তি জব্দ করতে হবে।

এই ধরনের একটি পরিস্থিতিতে বাড়তি বিনিয়োগে ব্যাংকগুলো এখন উভয় সংকটে পড়েছে এবং অর্থমন্ত্রী বলছেন সোনালী ব্যাংকের ১৮১টি শাখা লোকসান গুনছে এবং ৮০ হাজার কোটি টাকা অলস ব্যাংকের ভল্টে পড়ে রয়েছে। আবার রূপালী ব্যাংকের একটি অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বলেছেন নির্বাচনী বছরে সরকারি ব্যাংকগুলোকে ঋণ প্রদানে সতকর্তা অবলম্বন করতে হবে। কারণ এই ঋণের অর্থ নির্বাচনের কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। এখন ঋণখেলাপি হওয়ার ভয়ে বিনিয়োগ স্থবির কিংবা গুটিয়ে ফেলা মোটেই সঠিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বিনিয়োগের কোন বিকল্প নেই যাকে গতিশীল করতে হবে। বর্তমানে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ দেশের মোট বিনিয়োগের মাত্র ১০ শতাংশ অথচ দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ লোক গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে যাদের মূল পেশা কৃষি কিংবা কৃষি সম্পর্কিত প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজ যার একটি বড় অংশ নারী। আবার বিনিয়োগের একটি বড় মাধ্যম হলো ব্যাংক শাখা যার বর্তমানে ৫৭.২৮ শতাংশ রয়েছে গ্রামাঞ্চলে। গবেষণায় দেখা গেছে ঋণখেলাপির সংখ্যা গ্রামে কম। অন্যদিকে শহরের একজন ঋণ গ্রহীতার সমান গামের ১ লাখ ঋণ গ্রহীতা এবং এই একজন ঋণ গ্রহীতাই খেলাপির খাতায় অন্তর্ভুক্ত। এই সব পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সম্প্র্রতি ইফাদের ৪১তম পরিচালনা পর্ষদ সভার উদ্বোধনী ভাষণে বলেছিলেন দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ একটি বিবেচ্য বিষয়। এই ধারাবাহিকতায় দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে হবে এবং এর জন্য আর্থিক খাতে সমন্বিত কর্মসূচির প্রয়োজন। ঋণ নিয়ে রাজনীতি কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ মঞ্জুর যাকে ধরা হয় বৃহত্তর ঋণখেলাপির অন্যতম প্রধান কারণ তা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ যত আগ্রহ নিয়ে ঋণ মঞ্জুর করে ঠিক ততটুকু আগ্রহ নিয়েই ঋণ আদায়ের ব্যাপারে ব্যাংক ব্যবস্থাপনাকে নির্দেশনা দেবে এই প্রত্যাশা রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

BIGTheme.net • Free Website Templates - Downlaod Full Themes