রাতের কারওয়ান বাজারে ভ্যান-টুকরি মাথায় করে চলে জীবনের চাকা

0
3

রাত তিনটা। প্রতিনিয়ত যারা জীবন-জীবিকার তাগিদে লড়াই করেছেন, তাদের কাছে এই সময় ঠুনকোই মনে হবে। জীবনের চাকা ঘুরানোর যে স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীতে এসেছিলেন তারা। সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। তবুও থেমে নেই তাদের জীবনযুদ্ধ। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিন-রাত ভ্যানের চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছেন তারা। স্বপ্ন ছিল হয়তো কোনো দিন সুদিন ফিরবে। কিন্তু বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করলেও সুদিন ফেরেনি তাদের। এদেরই একজন ভ্যান চালক সুমন।

রাতের শেষভাগে যখন কর্মব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠছে রাজধানীর কারওয়ান বাজার। তখন বাজারের কোনো ব্যস্ততায় যেন তাকে স্পর্শ করছে না। প্রতিদিনের মতো গ্যারেজ থেকে ভ্যান নিয়ে ধুয়ে মুছে এসেছেন কাজের সন্ধানে। তখন কোনো কাজ না পেয়ে একাকী ভ্যানের উপর বসে অলস সময় পার করছেন মামুন।

রাজধানীর সবচেয়ে বড় কাঁচাবাজার কারওয়ান বাজারে গিয়ে এই চিত্র দেখা যায়। সুমনের মতো আরো অনেক ভ্যানচালক জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিন গভীর রাতে ভ্যান নিয়ে আসেন এই বাজারে। কিন্তু আগের মতো কাজ না পেয়ে সকাল বেলা সামান্য অর্থ নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় তাদের।

সুমনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জীবিকার তাগিদে ১২ বছর আগে রাজধানীতে এসেছিলেন তিনি। স্ত্রী-সন্তান আর বাবা-মা থাকেন সুনামগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে। প্রতিদিন গ্যারেজ থেকে ভ্যান ধুয়ে মুছে নিয়ে গভীর রাতে আসেন কারওয়ান বাজারে। এখানে কাঁচা বাজারের আড়তের তরকারি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে প্রতি রাতে ৫০০ টাকা বা বেশি আয় করেন। সেটা দিয়েই নিজের খরচ মিটিয়ে বাকি টাকা পাঠান পরিবারের জন্য। এভাবে ভালো দিন যাচ্ছিলো সুমনের। কিন্তু সম্প্রতি সেই আয়ে ভাটা পড়েছে করোনার কারণে। আগের মতো কাজ পাচ্ছেন না তিনি। এ কারণে বাজার মুখর হয়ে উঠলেও কাজ না পেয়ে প্রায় সময় ভ্যানের উপর অলস বসে কাজের অপেক্ষায় থাকেন। অপেক্ষায় থাকেন আহারের সংস্থানের জন্য।

এখন এমনও রাত যায়, একশো টাকা নিয়ে বাসায় ফিরতে হয় তার। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেদিন ভালো আয় হয়, সেদিন সর্ব্বোচ তিনশো টাকা আয় করতে পারেন। এটা দিয়ে এখন তিনি নিজের খরচ মিটিয়ে পরিবারের জন্য পাঠাতে পারছেন না।

তবে জীবন যুদ্ধে চালিয়ে নিতে হাল ছাড়ছেন না তিনি। প্রতিদিনই কাজের পাওয়ার আশা নিয়ে কারওয়ান বাজার আসছেন। নিজের খরচ কমিয়ে বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানদের জন্য কিছু টাকা হলেও পাঠাতে পারছেন এটাই তার কাছে মানসিক প্রশান্তির।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর অন্যতম এই বাজারটিতে দুইভাবে ভ্যান চলে। একটি হলো ভ্যানচালক ইউনিয়নের অধীনে, যারা শুধুমাত্র এই বাজারেই চালাতে পারবে। যাদের  ভ্যানে চেইন থাকবে না শুধু ঠেলে ঠেলে চালাতে হবে। অন্যটি হলো বহিরাগত ভ্যানচালক যাদের চেইন থাকবে এবং ইউনিয়নের আওতাধীন থাকবে না। তারা বিভিন্ন গ্যারেজ থেকে আসে, তাদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মহাজন যারা তাদের দিক নির্দেশনা দেন।

অন্যদিকে কারওয়ান বাজার ভ্যানচালক ইউনিয়নের আওতাধীন প্রত্যেক চালককে প্রতিরাতে ১০ টাকা করে জমা দিতে হয়। যা থেকে তাদের দুর্ঘটনা অথবা অসুস্থজনিত কারণে টাকা প্রদান করা হয়ে থাকে। এছাড়া তাদের পারিবারিক বিষয়েও সহায়তা করে থাকে বলে জানা যায়।

রাজধানীতে দুমুঠে খাবারের জন্য যারা আসেন সেই সুমনদের জন্য এটা যেন কর্মক্ষেত্র। কারওয়ান বাজার তাদের কাছে তাই অনেকটা অন্নের বাজারের মতো। ভালো আয় হলে পরিবারের মুখে অন্নের সংস্থান হয়, না হলে পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন পার করতে হয়। কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন কর্মব্যস্ততা থাকলেও ভ্যানের চাকায় চলা তাদের জীবনযুদ্ধ কখনও থেমে থাকে না। কারওয়ান বাজারে প্রতিদিন কর্মব্যস্ততা থাকলেও ভ্যানের চাকায় চলা তাদের জীবনযুদ্ধ কাজ না পেলে কখনও কখনও থেমে থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here