রংপুর মেডিকেল কলেজের লোগোতে তামাকের পাতা!

0
20

আশ্চর্যজনক হলেও সত্য রংপুর মেডিকেল কলেজের লোগোতে মানব স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর তামাকের পাতার ব্যবহার করা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের স্বনামধন্য এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রামে তামাকের পাতার ব্যবহারে রংপুরের সচেতন মহল চরম ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। অতি দ্রুত তারা মেডিকেল কলেজের লোগো থেকে তামাকের পাতা তুলে দিয়ে লোগো পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭০ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে উত্তরাঞ্চলের সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির লোগোর দুই পাশে ব্যবহার করা হয় তামাকের পাতা। অথচ তামাক ব্যবহারজনিত রোগে দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার লোকের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া তামাকের কারণে কয়েক লাখ মানুষ পঙ্গুত্ববরণসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে শয্যাশায়ী।

তামাকের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ২০১৬ সালের ৩০-৩১ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন’ শীর্ষক সাউথ এশিয়ান স্পিকার’স সামিট এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছেন।

এদিকে বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলায় ১০ হাজার পরিবারের উপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা যায়, তামাক ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রধান তিন ধরনের ক্যান্সারে (ফুসফুস, স্বরযন্ত্র ও মুখ) আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তামাক অব্যবহারকারীদের চেয়ে ১০৯ শতাংশ বেশি। এছাড়াও তামাক ব্যবহারকারীদের সাত ধরনের প্রাণঘাতী রোগ, যেমন- স্ট্রোক, হৃদরোগ ও যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তামাক অব্যবহারকারীদের চেয়ে ৫৭ শতাংশ বেশি। এছাড়া সরাসরি তামাক ব্যবহার কিংবা পরোক্ষ ধূমপানের ফলে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যা থেকে ২০১৭ সালে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে ৩০,৫৭০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১.৪ শতাংশ। অথচ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে লাভের পরিমাণ ২২,৮১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ কেবল ওই এক অর্থবছরেই ঘাটটির পরিমাণ প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। তামাক চাষ ও ধূমপানের ফলে উদ্ভূত পরিবেশগত অবনতি বিবেচনায় আনলে এ ক্ষতির পরিমাণ আরো অনেক বৃদ্ধি পেত বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়।

অথচ ১৯৭০ সালে রংপুর অঞ্চলকে তামাকের জন্য বিখ্যাত এমনকি তামাককে অর্থকরি ফসল হিসেবে বিবেচনা করে ঐতিহ্যবাহী রংপুর মেডিকেল কলেজের লোগোতে তামাক পাতা ব্যবহার করা হয়েছে বলে রংপুরের বিশিষ্টজনরা জানিয়েছেন। বর্তমানে রংপুরবাসী মনে করছেন- তামাক আসলে অর্থকরি কোনো ফসল নয় বরং এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি পণ্য। তাই তারা রংপুরে তামাকচাষ বন্ধের পাশাপাশি রংপুর মেডিকেল কলেজের তামাক পাতা সম্বলিত লোগো থেকে অনতিবিলম্বে ক্ষতিকর এই তামাক পাতা অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।

মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংস্থা ‘এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি’র তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের রংপুরের এডভোকোসি অফিসার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো অবস্থাতেই তামাক অর্থকরি ফসল হতে পারে না। তামাক মানুষের ক্ষতি ছাড়া উপকার করে এমন তথ্য বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর একজন মানুষও দিতে পারবে না। তবে কেন রংপুর মেডিকেল কলেজের লোগোতে তামাকের পাতা? তাই আমি অনতিবিলম্বে ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লোগো থেকে তামাকের পাতা অপসারণে কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশ মেডিকেল এ্যাসোসিয়েশন (বিএম) রংপুর জেলা শাখার সভাপতি ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এক সময় তামাককে রংপুরের ঐতিহ্য হিসেবে এখানকার মানুষ মনে করতো। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। তাই রংপুর মেডিকেল কলেজের মনোগ্রামে তামাকের পাতার পরিবর্তে রংপুরের শতরঞ্জি শিল্পের ডিজাইন ব্যবহার করা যেতে পারে।’

তামাক নিয়ন্ত্রণ কোয়ালিশনের রংপুরের ফোকাল পার্সন সুশান্ত ভৌমিক বলেন, ‘রংপুরে বর্তমানে তামাকের কোনো ঐতিহ্য নেই। আর এটি থাকার কথাও নয়। আগে রংপুরে তামাকের চাষাবাদের পাশাপাশি বেশ কিছু বিড়ি ও জর্দ্দা ফ্যাক্টরি ছিল। কিন্তু রংপুরের মানুষ আজ স্বাস্থ্য সচেতন হয়েছে। যার কারণেই বর্তমানে রংপুরে তামাক চাষ ও ফ্যাক্টরি অনেক কমে গেছে। আর রংপুর মেডিকেল কলেজের লোগোতে তামাকের পাতা এটি আসলে ভাবতেই অবাক লাগে। তাই আমি অতিসত্বর মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর তামাক পাতা রংপুর মেডিকেল কলেজের লোগো থেকে অপসারণের জোর দাবি জানাচ্ছি।’

তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রংপুর মেডিকেল কলেজের লোগো থেকে তামাক পাতা অপসারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. একেএম নুরুন্নবী।

তিনি বলেন, ‘এক সময় রংপুর তামাকের জন্য বিখ্যাত ছিল। এটিকে এই অঞ্চলের অর্থকরি ফসল এমনকি ঐতিহ্য হিসেবে ভাবা হতো। তাই এটির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এটিতে হয়তো লোগোর ডিজাইনার তামাকের পাতার ব্যবহার করেছেন। তবে বাংলাদেশে তামাকের দিন শেষ। তাই আমরা রংপুর মেডিকেল কলেজের লোগো থেকে তামাকের পাতা বাদ দেয়ার বিষয়টি ভাবছি। অতি দ্রুত একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। তামাক পাতার পরিবর্তে জাতীয় ঐতিহ্য বহন করে এমন কোনো প্রতীক লোগোতে সংযুক্ত করার বিষয়ে প্রস্তাব করা হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here