সিনেমাহীন তিন বছর পপি

0
116

‘পৌষ মাসের পিরিত’। গ্রামীণ গল্পের একটি রোমান্টিক চলচ্চিত্র। এর নির্মাতা নার্গিস আক্তার। এখানে টনি ডায়েসের বিপরীতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন ঢাকাই সিনেমার সুপারস্টার নায়িকা সাদিকা পারভীন পপি।

অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর। তারপর দেখতে দেখতে কেটে গেছে তিন বছরেরও বেশি সময়। যে নায়িকা একদিন প্রতি বছরে একাধিক সুপারহিট সিনেমা উপহার দিতেন সেই নায়িকার ক্যারিয়ারে তিন বছর কেটে গেল নতুন কোনো সিনেমা ছাড়াই। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোনো সিনেমা না আসলে চার বছর পূর্ণ হবে সিনেমাহীন পপির। এটা ভক্তদের জন্য বেদনার তেমনি নায়িকা পপির জন্যও হতাশার।

এই তিন বছরে বেশকিছু ছবিতে নাম শোনা গেছে পপির। ‘কাঠগড়ায় শরৎচন্দ্র’, ‘সাহসী যোদ্ধা’র মতো কিছু ছবির শুটিংও করলেও কোনোটিই মুক্তির মুখ দেখেনি।

মাঝখানে কিছুদিন তাকে দেখা গেছে ছোটপর্দার অভিনয়ে। বিশেষ বিশেষ দিবসগুলোতে তিনি হাজির হতেন নাটক-টেলিছবিতে। মিউজিক ভিডিওতেও কাজ করেছেন। তাকে দেখা গেছে নির্মাণের নতুন ট্রেন্ড অনলাইন প্লাটফর্মের ওয়েব সিরিজেও। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আলোচনা ছাড়া প্রায় কোথাও নেই তিনি। ছোটপর্দা, বড়পর্দা কিংবা অনলাইন দুনিয়া- সবখানেই হারিয়ে গেছেন পপি!

বছরজুড়ে পপিকে এখন খবরে পাওয়া যায় নানা রকম নির্বাচন উপলক্ষে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে পপি জয়ী হয়েছিলেন মিশা-জায়েদ প্যানেল থেকে কার্যকরী সদস্য পদে। সেই মেয়াদ শেষ হয়ে নানা অভিযোগে বিদ্ধ বিতর্কিত ২০১৯ সালের শিল্পী সমিতির নির্বাচনে তিনি অংশ নেননি। তবে নির্বাচনের পুরোটাজুড়েই আলোচনায় ছিলেন জায়েদ খানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে।

নির্বাচন শেষে আবারও আড়ালে চলে যান পপি। হঠাৎ করেই তার নাম শোনা যায় বাংলাদেশ ফিল্ম ক্লাবের নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে অমিত হাসানের প্যানেল থেকে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে জয়ীও হয়েছেন তিনি। গত তিন বছরে নায়িকা পপির অর্জন শিল্পী সমিতির পর ফিল্ম ক্লাবের নির্বাচনে জয়ী হওয়া এবং কিছু সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে আলোচনায় থাকা।

নায়িকা পপির নামের পাশে যে অর্জন একেবারেই বেমানান। যে পপি মৌসুমী-শাবনূরের রাজত্বে হানা দিয়ে নিজের রাজত্ব গড়ে নিয়েছিলেন সেই পপির এমন পতন মেনে নেয়া যায় না।

তবুও সিনেমা নিয়ে আড্ডা-আলোচনায় শুনতে হয়, ফুরিয়ে গেছেন পপি। তাকে নিয়ে আর প্রযোজকরা সিনেমা করার স্বপ্ন দেখছেন না। পরিচালকরাও আগ্রহী হচ্ছেন না। যারাও বা ভাবেন তারা একক নায়িকা হিসেবে আর পপির ওপর ভরসা রাখেন না।

গ্ল্যামার, সৌন্দর্য, অভিনয়; কখনোই কমতি ছিল না পপির। বয়সে চল্লিশের কোটা পেরিয়েছেন অনেক আগেই। তবুও নিজেকে ধরে রেখেছেন তিনি আকর্ষণীয় ফিগারে। তবু কেন নেই পপি? কেন হারিয়ে গেলেন পপি? উত্তর পেতে চলতেই পারে গোলটেবিল বৈঠক।

আপাতদৃষ্টিতে বলা যায়, নায়ক সংকটই পপির ক্যারিয়ারকে হতাশার মাঝ দরিয়ায় ভাসিয়ে দিয়েছে। পপি এসেছিলেন সালমান শাহের নায়িকা হিসেবে সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে। কিন্তু তার নায়িকা হয়ে শুটিং করার সৌভাগ্য তার হয়নি। ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন ওমর সানির বিপরীতে ‘কুলি’ সিনেমা দিয়ে।

এরপর শাকিল খানের সঙ্গে জুটি বেঁধে তুমুল জনপ্রিয়তা পান। স্টার থেকে সুপারস্টারে পরিণত হন পপি। অভিনয়ের সূত্রেই শাকিল-পপি প্রেমে জড়ান। তাদের বিয়ে নিয়েও ছড়ায় অনেক গুঞ্জন। সেই সম্পর্কের নেতিবাচক প্রভাবেই নাকি ভেঙে যায় শাকিল-পপি জুটি। শাকিল সিনেমায় অনিয়মিত হয়ে পড়েন। এরপর ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, রুবেল, আমিন খান, রিয়াজ, ফেরদৌস ও শাকিব খানের নায়িকা হয়ে ক্যারিয়ার বাঁচিয়ে রাখেন পপি। তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই তার সুপারহিট সিনেমা রয়েছে।

২০০৮ সালে পপির পতনের শুরু, নায়ক মান্নার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। মান্না প্রয়াত হওয়ার পর নানা কারণে সিনেমায় অনিয়মিত হয়ে পড়েন রুবেল, আমিন খান, রিয়াজ, ফেরদৌসরা। শাকিব খান বাঁধা পড়েন অপু বিশ্বাসের সঙ্গে জুটির জনপ্রিয়তায়। পাশাপাশি তিনি কম বয়সী নায়িকাদের দিকে মনোযোগী হয়ে পড়েন।

স্বাভাবিকভাবেই পপির নায়ক সংকট দেখা দেয়। সেই সংকট কাটাতে অনেক পরিচালক ও প্রযোজক নায়ক ইমন, জায়েদ খানদের সঙ্গে পপিকে নিয়ে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী পপি ভুগছেন নায়কহীনতায়। ইন্ডাস্ট্রি ভুগছে পপির মতো জাঁদরেল অভিনেত্রীহীনতায়। আর সিনেমার দর্শক ভুগছেন পপিহীনতায়। পপির কী মন খারাপ হয় সেইসব দিনের কথা ভেবে?

এছাড়াও সিনেমায় চাহিদা না থাকলেও সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক না কমানো, বর্তমান সময়ের ব্যস্ত নায়ক শাকিব খানের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব, গেল কয়েক বছরে সবচেয়ে ব্যস্ত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে দূরত্ব, নতুন প্রজন্মের প্রযোজক-পরিচালকদের সঙ্গে সুসম্পর্কের অভাব পপিকে ছিটকে দিয়েছে ঢাকাই সিনেমা থেকে।

এক সময়ের তুমুল ব্যস্ত নায়িকা আজ সিনেমাহীন, শুটিংবিহীন। গত কয়েক বছরে গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকার বা নিউজের বক্তব্যে নতুন সিনেমার খবরে পপি জবাব দিয়েছেন মুখস্ত কিছু কথায়। সেগুলো ছিল, ‘কিছু ছবি মুক্তির অপেক্ষায়। নতুন কিছু ছবি শুরু হবে।’ কখনো বা ছবি না থাকার বিষয়টি এড়াতে হয়ে বলেছেন, ‘একটু বেছে বেছে কাজ করছি।’

এভাবে হঠাৎ করে দেখা গেল পপিকেই হারিয়ে ফেলেছে ঢালিউড!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here